লালমনিরহাট বার্তা
পরিবেশবাদীরা কখনো পুঁজিবাদি হয় না
শমশের আলী : Jun 9, 2021, 7:54:16 PM সময়ে

পরিবেশবাদীরা কখনো পুঁজিবাদি হয় না

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পরিবেশ কর্মীদের মতে, প্রকৃতির উপাদান বা সম্পদ মূলত: ৫টি যথা: সূর্যালোক, মাটি, পানি, বায়ু ও সকল প্রকারের জীবন। প্রতিটি সম্পদ অদ্বিতীয় ও অনন্য, যার কোন বিকল্প নাই। পৃথিবীর স্থায়িত্বশীলতার জন্য প্রতিটি সম্পদের ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হওয়া দরকার। আর ৫৯৭৪ বিলিয়ন মে. টন ওজনের এই পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের মোট পরিমান অপরিবর্তনীয়। এর কোন একটার পরিবর্তন হওয়া মানে অন্য কোনটার পরিমান বা সংখ্যার তারতম্য হওয়া, অর্থাৎ ভারসম্যাহীনতা তৈরি হওয়া। পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা সকলকে সুস্থ ও সুখী রাখতে পারে। তাই, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আর, প্রকৃতির নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আমাদের জীবনে বিপত্তি নেমে আসবে। এটাই স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে পর্যন্ত প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে তেমন কোন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছিল না। তাছাড়া, বিভিন্ন ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠির আচার ও রীতিতে পরিবেশ সুরক্ষার ও পদ্ধতি কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। তবে, শিল্প বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পুঁজির যোগান। এই পুঁজির অনেকটাই এসেছিল ঔপনিবেশিক দেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য থেকে। দেখা যায়, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে ঔপনিবেশিকতার বিস্তার ও মানবাধিকারের হরণ তরান্বিত হতে থাকে। শিল্প বিপ্লবের এই ধারা এখনো সচেষ্ট আছে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, আমেরিকা, রুশ প্রজাতন্ত্র ও গণচীনে। বাকি দেশগুলো এর ধারাবাহিকতার নিঃস্বরণ দ্বারা বায়ু দূষণ, বিষাক্ত বর্জ্য দ্বারা পানি ও মাটির দূষনের ফলে, খাদ্যে বিষক্রিয়া, বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ও সংক্রামণ জনস্বাস্থ্যহানী, জলবায়ুর অভিঘাত, ইত্যাদি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমাদের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্প বিপ্লবের ফলে পরিবেশের যে বিপর্যয় ঘটেছে, তা বুঝেই ২রা এপ্রিল ১৮৮৬ সালের সভ্যতার প্রতি কবিতাটি লিখে যান। তিনি এই কবিতায় শিল্প কারখানা প্রসুত সভ্যতাকে সর্বগ্রাসী আখ্যা দিয়েছেন। আর ফিরে পেতে চেয়েছেন, স্বাধিনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, পুন্যচ্ছা?য়ারাশি, গøানিহীন দিন, সন্ধ্যা¯œান, গোচারনভূমি ইত্যাদি।
পরিবেশ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় যুগে যুগে কিছু সচেতন মানুষ বা পরিবেশ কর্মী সক্রিয় ছিল, আছে ও থাকবে। গবেষণা ও বিজ্ঞান প্রসূত জ্ঞান বা প্রমাণ সাপেক্ষে পরিবেশ দূষণের প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সচেতন করতে পরিবেশ কর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করে চলেছে।
উনবিংশ শতকের শুরুতেই পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে কিছু মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। তা ধীরে ধীরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরিতে সহায়তা করে এবং পরবর্তিতে বিশ্ব পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি জাতিসংঘের এজেন্ডাভুক্ত হয়। সেই চেষ্টা থেকে ১৯৭২ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশের বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের সকল পরিবেশ কর্মী এই দিবস পালন করে থাকে। যখনই পরিবেশের নূন্যতম ক্ষতি হচ্ছে বা ক্ষতির কারণ দেখা দিচ্ছে, তখনই পরিবেশ কর্মীরা নির্দ্ধিধায় তার বিরুদ্ধাচরণ করছে, সুরক্ষায় সচেষ্ট হচ্ছে। কারণ, পরিবেশবাদীরা কখনোই পুঁজিবাদী হয় না।
পরিবেশ বিরুদ্ধ কর্মকান্ডের ফলে গত তিন দশকে ঢাকা জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ জলাভূমি ও সারাদেশে শতাধিক নদ-নদী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উপরন্তু, সকল প্রকার শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল, বায়ুমন্ডল ও মাটিতে মিশে যাওয়ায় মানুষসহ সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে বিষক্রিয়ার কারণে স্বাস্থ্যহানী, চিকিৎসা ব্যয় ও জনভোগান্তি বেড়েই চলেছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের দেশীয় মাছের অন্তত ২০টি প্রজাতির আর কোন হদিস মেলে না এবং ১০০টি মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত পায়। দেশীয় জাতের অনেক পশু পাখিও আজ বিপন্ন হতে চলেছে। এ সবকিছুই জনস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
পরিবেশ কর্মীদের দাবির মুখেও আজো সকল শিল্প কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের কেন্দ্রীয় শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপন বা সচল করা হয়নি। শিল্প কারখানা থেকে মালিক পক্ষ লাভবান হলেও, লাল ও কমলা ধরনের শিল্প কারখানার বর্জ্য থেকে পরিবেশের যে পরিমানে ক্ষতি হচ্ছে, তা পুনঃরোদ্ধারের কর্মসূচির জন্য ব্যায়ের যোগান দিতে ‘পরিবেশ কর’ এখনো আরোপ হয়নি। অর্থাৎ শিল্প কারখানার লাভের পুরোটাই মালিক পক্ষের, আর ক্ষতির ভাগ জনগণের। তাছাড়া জনবহুল ও ক্ষুদ্রায়তনের এই দেশের আর কতো শিল্প কারখানার বর্জ্য ও দূষণের চাপ বইতে হবে? বা দুষণের চাপ সইতে সক্ষম? পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন!
তাছাড়া, পরিবেশবান্ধব বন ও গাছকাটা বন্ধ করতে হবে। তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে জাতিসংঘ প্রণীত আইনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অনুস্বাক্ষর করে এবং তা পালনে বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, আমাদের একটায় পৃথিবী। তাই এখনই পৃথিবীর পরিবেশের ক্ষতি রোধ ও কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই বিশ্ব সবার জন্যই বসবাসের অনুপযোগি হয়ে পড়বে।
পরিবেশ কর্মীরা আর্থিক বা অন্য কোন ফায়দা হাসিল করতে কাজ করে না। তারা কারো ক্ষতি না করে নিজেদের ও পরবর্তি প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে। দেশের কর্ণধার হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হলো, পরিবেশ কর্মীদের সদ্বিচ্ছার মূল্যায়ন করা এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করা।
লেখক: সদস্য সচিব, নদী অধিকার মঞ্চ।