লালমনিরহাট বার্তা
||চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি||
বার্তা ডেস্ক | ১৬ জুন, ২০২৪, ৬:২৭ AM
||চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি||

১৯১৭ সালে চিত্তরঞ্জন দাসের জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক হিসেবে মওলানা ভাসানী প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এই দলের পক্ষে প্রচারকাজে অংশগ্রহের মধ্য দিয়ে তিনি দেশবন্ধুর দৃষ্টি আকষর্ণ করেন। একই বছর তিনি কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের ৩৩তম অধিবেশনে দশর্ক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তখন ভারতরক্ষা আইনে অনেকের মতো কংগ্রেস নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলীও কারাগারে। চিত্তরঞ্জন তাদের মুক্তির জন্য আন্দোলনের অংশ হিসেবে ময়মনসিংহ আসেন। সেখানে তাঁর উদ্দীপক ভাষণ শুনে তরুন আবদুল হামিদ খান উজ্জীবিত হন।চিত্তরঞ্জন দাস এসময়ে এমন একজন মুসলিম যুবককে খুঁজছিলেন যিনি একাধারে ধমর্প্রাণ ও কৃষক শ্রমিকের জন্য নিবেদিত বন্ধু। যুবক আবদুল হামিদের ভেতর তিনি সেই অগ্নিশিখা দেখতে পান এবং সস্নেহে তাঁকে উৎসাহিত করেন। ১৯১৯ সালে চিত্তরঞ্জণ দাস ও মওলানা মোহাম্মদ আলীর অনুপ্রেরণায় ভাসানী কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং কারাবরণ করেন। কারাগারে তিনি অনেক খ্যতনামা রাজনীতিক ও কর্মীর সংস্পর্শে আসেন।১৯১৯-এর মে মাসে ময়মনসিংহ কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন উপলক্ষে পত্নী বাসন্তি দেবী, কন্যা ও জামাতা সুধীর রায়সহ চিত্তরঞ্জণ দাস ময়মনসিংহে এসেছিলেন। এসময় দেশবন্ধুর দেশপ্রেম ও জনসেবার আদর্শ দ্বারা ভিষণভাবে অনুপ্রাণিত যুবক ভাসানী তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে আসেন।১৯২০ সালের মে মাসে আলী ভাতৃদ্বয়, হাকিম আজমল খাঁ, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখের নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন জোড়দার হয়ে ওঠলে ভাসানী তাতে যোগদান করেন। ৪ মে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশগ্রহন করেন। কিন্তু পোষাক-পরিচ্ছেদের ব্যাপারে তাঁর আপোষহীন দৃঢ়তার কারণে নানা সময় শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত নেতাদের কাছ থেকে তিনি উপযুক্ত মর্যাদা পাননি। তবে চিত্তরঞ্জণ দাস তাঁকে সাদরে গ্রহন করতেন। এজন্য দেশবন্ধুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার শেষ ছিল না।১৯২১ সালে চিত্তরঞ্জণ দাসের নেতৃত্বে সারা বাংলায়  যে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল, ভাসানী তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন এবং আবারও গ্রেফতার বরণ করেন।১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা ও মহামারী দেখা দিলে বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, চিত্তরঞ্জণ দাস, সুভাষ বসু প্রমুখ দেশবরেণ্য নেতাদের সহকর্মী  হিসেবে ত্রাণকাজ পরিচালনা করে ভাসানী তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাঁর পরার্থপরতা, সততা ও পরিশ্রমে মুগ্ধ হয়ে দেশবন্ধু তাঁকে ময়মনসিংহ ত্রাণশিবিরের 'উপনেতা' নিযুক্ত করেন। এ প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেনঃ "বাংলা ১৩২৯ সালের বন্যাও আমার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে বিপুলভাবে নাড়া দিয়াছিল। সেই সনে উত্তরবঙ্গে এক অভাবনীয় বন্যা হইয়াছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, অতিবৃষ্টির দরুন সান্তাহার জংশনে কোমর-সমান পানি হইয়া গিয়াছিল। রিলিফের কাজে আমরা কয়েকজন সেখানে পৌঁছিয়া কিভাবে কি করা যায় ভাবিতেছিলাম। একদিন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জণ দাস আসিয়া হাজির, সঙ্গে ছিলেন বাংলার বিপ্লবী সন্তান সুভাষ বসু। দেশবন্ধুর হাতে দশ সের চিড়ার একটি পোটলা ছিল। উহা লইয়া তিনি যখন পানিতে নামিয়া পড়িলেন তখন আমরা কেহ দাঁড়াইয়া থাকিতে পারি নাই। এই স্মৃতিচারণ আমি কতদিন করিয়াছি। ভাবিয়াছি- এইই বুঝি আমার রাজনৈতিক জীবনে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল।"'২২ সালে চিত্তরঞ্জণ দাসের সাথে গান্ধীর মতবিরোধ দেখা দিলে দেশবন্ধু কংগ্রেস ছেড়ে স্বরাজ্য দল গঠন করেন। মওলানা ভাসানী এসময় চিত্তরঞ্জণ দাস ও সুভাষ বসুর তেজস্বিতায় মুগ্ধ হয়ে বাংলার বিশেষ করে উত্তরবাংলার গ্রামাঞ্চলে কংগ্রেস ও স্বরাজ্য দলের হয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেন। জমিদার-মহাজনদের অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ কৃষকদের সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে তিনি কেন্ত্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেনদরবার চালিয়ে যান। ১৯২৪ সালে তিনি সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রদেশিক সম্মলনে যোগ দেন। ইতিমধ্যে গ্রামে গ্রামে সামন্তবাদবিরোধ আন্দোলন শুরু করায় জমিদারেরা তাঁর বিরুদ্ধে  ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রশাসন ও স্থানীয় জমিদারদের ষড়যন্ত্রে টিকতে না পেরে তিনি আসামের ধুবড়ী চলে যান। ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দেশবন্ধুর আকস্মিক পরলোকগমনে তিনি যারপরনাই মূর্ষিত হন এবং বাংলার অসাম্প্রদায়িক ও গণমূখী রাজনীতির ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। তাঁর এই দুঃখের কথা প্রায়ই তিনি বলতেন। আমরা আজও তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি।

সূত্রঃ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সৈয়দ আবুল মকসুদ।   

এই বিভাগের আরও খবর