লালমনিরহাট বার্তা
উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি
পারভেজ এলাহী চৌধুরী : May 1, 2021, 6:44:05 PM সময়ে

উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধে লালমনিরহাট...

পর্ব-১ এ বিষয়ে সকলেই একমত যে, বাংলাদেশের বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ ছিল সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হ্যাঁ ১৯৭১এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনেও একটি আতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে এবং থাকবে। আমি সেই গৌরবময় যুদ্ধের একজন জীবন্ত সাক্ষী ও ৭১এর যুদ্ধে শত্রুর নৃশংসতার শিকার হয়ে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারা একজন হিসাবে অত্যন্ত গর্ববোধ করি। এক দিকে যেমন হাজার বছর পর বাঙ্গালীজাতি এই যুদ্ধ জয়ের পর প্রথম তাঁদের স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছে, তেমনি এই যুদ্ধে আমাদের পরিবারে তিনজন সদস্যসহ লক্ষ বাঙ্গালী তাঁদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। আমি সেই সকল আত্মার চির শান্তি কামনা করি! পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বিশাল ব-দ্বীপ অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় বাঙালী কখনোই যুদ্ধাস্ত্র বহন করেনা, যা এই উপমহাদেশের পশ্চিম অংশের সমাজে খুবই স্বাভাবিক। কৃষি প্রধান বাঙ্গালী কৃষক, তার প্রয়োজনিয় কৃষি কাজের সরঞ্জাম ছাড়া কখনো কোন অস্ত্র বহন করেনা। তারা রাইফেল, বন্দুক বা ছুরি তলোয়ার বহনে অভ্যস্ত নয় এবং তা সামাজিকরীতিও নয়। না, তারা যুদ্ধবাজ জাতি নয়, তারা কখনোই অন্যের দেশ আক্রমণ করে নাই কিন্তু তারা বারবার আক্রান্ত হয়েছে বহিঃশত্রু দ্বারা, যেমনটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে। বাঙ্গালী কখনোই প্রথমে যুদ্ধ শুরু করেনি, যুদ্ধটা তাঁদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে । সেই ১৯৫২র ভাষা আন্দলনের শুরু থেকে দীর্ঘ ১৯ বছরের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলমান শান্তিপূর্ণ স্বাধিকার আন্দোলনের পথেই নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর হঠাৎ করেই ২৫মার্চ ১৯৭১-এর গভীর রাতে পাকিস্তানি সরকার তাদের আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা তার সকল প্রকার আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর আক্রমন চালায়। একতাবদ্ধ নিরস্ত্র বাঙ্গালী ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর প্রথম প্রহরে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং তাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ অনুযায়ি যার যাকিছু ছিল নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করে। শুরু করে আত্মরক্ষা এবং প্রতিরোধ যুদ্ধ যা এই দেশেকে শত্রু মুক্ত করতে একটি পুর্নাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রু মুক্ত হয় । আমি আপনাদের সাথে আমার দেখা সেই গৌরবময় ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে চাই। আমার বাবা ও মায়ের জন্মস্থান যথাক্রমে সিলেটের বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে হলেও তাঁরা জীবনের একটি বিরাট অংশ বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে কাটিয়েছেন। বাবা শহীদ আবদূর রহমান চৌধুরী একজন পুলিশ অফিসার হিসাবে তাঁর জীবন শুরু করেছিলেন ততকালীন আসাম পুলিশে। ১৯৪৭-এর পর পূর্ব পাকিস্তানের সিলেট, বগুড়া ও রংপুরে চাকুরী করেন। পরবর্তীতে কুড়িগ্রামে মহকুমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা (ডিআইবি) হিসাবে কর্মরত ছিলেন এবং কুড়িগ্রাম হয় আমার জন্মভুমি। কুড়িগ্রাম রিভারভিউ হাই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে আমি অষ্টম শ্রেণী শেষ করি। বাবা ১৯৬৯ সালে রংপুরের সৈয়দপুরে বদলি হলে আমি সৈয়দপুর হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ১৯৭০ এ দশম শ্রেণী শেষ করে ১৯৭১ সালের অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি (ম্যাট্রিক) পরিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। বাবা ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে পূর্বপাকিস্তান রেলওয়ে পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা (আরআইও) হিসাবে লালমনিরহাট বদলি হন। এবার বাবা-মাসহ আমাদের ৬ সদসস্যের পরিবার জানুয়ারি ১৯৭১-এ লালমনিরহাট শহরে আসি। আমাদের বাসা হয় লালমনিরহাট থানা সংলগ্ন মাঠের পশ্চিম দিকে। আমাদের সব বড়ভাই ইশফাক ইলাহী চৌধুরী সেই সময়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ফ্লাইং অফিসার হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সাকেসারে কর্মরত। বড় বোন তারিফা আহমেদ ১৯৭০-এর অক্টোবরে বিয়ের পর তাঁর স্বামী জসীম আহমেদের সাথে ঢাকায় থাকেন। তাঁর পরের বোন পারভীন আখতার চৌধুরী ঢাকার ইডেন কলেজে বি.এ অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি তখন কলেজের হোস্টেলে থাকেন। আমার বড় ভাই তোফায়েল ইলাহী চৌধুরী লালমনিরহাট কলেজে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে ও আমাদের সব ছোট ভাই তওফিক ইলাহী চৌধুরী লালমনিরহাট হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। আমাদের চাচাত ভাই আবুল হাসনাত চৌধুরী, আমারই সমবয়সি। বাবা তাঁকে আমাদের সিলেটের দাদা বাড়ী বিয়ানীবাজার থানার শালেশ্বর গ্রামের বড় চাচা আজমল আলী চৌধুরীর কাছ থেকে লেখাপড়ার উদ্দ্যশ্যে সেই ছোটবেলাতেই আমাদের পরিবারে নিয়ে আসেন। চাচাত ভাই আবুল হাসনাত চৌধুরী আমাদের পরিবারের সদস্য হয়েই গড়ে উঠছিল এবং লালমনিরহাট হাই স্কুলেই দশম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। একমাত্র আমি লালমনিরহাটের কোন স্কুলে ভর্তি হলাম না, কারন আমি সৈয়দপুর হাই স্কুলের ছাত্র হিসাবে ১৯৭১ সালের জুনে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরিক্ষার্থী। তাই বাড়িতে থেকেই আগামী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। লালমনিরহাট যদিও সেকালে ছিল কুড়িগ্রাম মহকুমার অধিন একটি প্রশাসনিক থানা কিন্তু মুলত একটি গুরুত্তপূর্ণ রেলওয়ে জংশন ছাড়াও উত্তর বঙ্গের রেল যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। সমগ্র উত্তর বঙ্গের (পাকশি-পার্বতীপুর-লালমনিরহাট) এই ত্রিভুজের নিয়ন্ত্র হয় লালমনিরহাট থেকে। এখানে আছে পূর্ব পাকিস্তান রেলেওয়ের নানা কার্যালয় ও কর্মকর্তাদের জন্য ট্রেইনিং স্কুল। তবুও জনসংখ্যা ও আয়তনে সৈয়দপুরের চেয়ে বেশ ছোট কিন্তু রেলওয়ে শহর হওয়ায় এখানেও প্রচুর অবাঙ্গালীর বসবাস যাদের অধিকাংশই পূর্বপাকিস্তান রেলওয়ের বর্তমান ও অবসর প্রাপ্ত কর্মচারি ও ব্যবসায়ী। ১৯৪৭ এর পর বহু মুসলমান অবাঙ্গালীর ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে পূর্ববাংলায় উদবাস্তু হিসাবে চলে আসে যারা স্থানীয়ভাবে “বিহারী” হিসাবে পরিচিত। সমগ্র বাংলাদেশের তুলনায় উত্তরবঙ্গের গুটিকয় শহরেই এই নবাগত অবাঙ্গালী মুসলমানদের অধিকাংশ বসতি গড়ে উঠে। যেমন সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, পার্বতীপুর, ও সান্তাহার। এছাড়া ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, চট্টগ্রামের পাহাড়তলি, খুলনার খালিশপুর ও দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে। পাকিস্তানি আমলে এসব বড় শহরে অবাঙ্গালীদের প্রয়োজনে উর্দু স্কুল ও কলেজ ছিল। সৈয়দপুরের মোহাম্মদ আলী জিন্না কলেজেও উচ্চ শ্রেণীতে আলাদা উর্দু ভাষা বিভাগ চালু ছিল। ঢাকা থেকে উর্দু পত্রিকা ও বই পত্র ছাপা হত। ঢাকার অনেক ভালো উর্দু সিনেমা পশ্চিম পাকিস্তানের লাহরের সিনেমার সাথে পাল্লা দিত। আমরাও ছাত্র অবস্থায় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত উর্দু বাধ্যতামুলক ভাবে পড়তাম। কিন্তু সৈয়দপুরের উর্দু স্কুলের উর্দুভাষী ছাত্ররা কখনো বাংলা ভাষা শেখা বা চর্চা করতো না বা আমাদের মতো তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা বাধ্যতামুলক ছিল না। এসব নানা কারণে ভারত থেকে উদবাস্তু হিসাবে আগত বিরাট সংক্ষক অবাঙ্গালী মুসলমান স্থানীয় জনগনের সাথে না মিশে তারা নিজেদের মধ্যেই একপ্রকার গেটো সংস্কৃতি তৈরি করে। উর্দুভাষী বলে তারা নিজেদেরকে স্থানিয় বাংগালীদের চেয়ে উচ্চস্তরের মুসলমান বলেও মানসিক মনোভাব সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ দেশেই ভিনদেশী হিসাবে গড়ে তোলে যাকে তাদের নেতৃত্ত বা পাকিস্তানের নেতৃত্ত শুরু থেকেই সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। অবশ্য সরকারি চাকুরী ও ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা পাকিস্তান সরকারের যথেষ্ট অনুকুল্য পেয়ে অর্থনৈতিক ভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠে, যা স্থানীয় বাঙালীদের সন্দেহের সৃষ্ট করে।১৬ বছর জীবনে দেখা বাবার তিন জন ব্যক্তিগত পুলিশ দেহরক্ষীর তিন জনই ছিলেন অবাঙ্গালী বা বিহারী এবং আমরা তাদেরকে চাচা বলেই সম্মোধন করতাম । কুড়িগ্রামে ছিলেন আব্দুল হাই, সৈয়দপুরে আব্দুল কাইউম খান, এবং সর্বশেষ লালমনিরহাটে ছিলেন কমর উদ্দিন। তাঁদের সকলের সাথেই আমাদের খুবই ভাল ও সুন্দর সম্পর্ক ছিল, যা বাবার সরকারি দায়িত্ব ছাড়িয়ে পারিবারি পর্যায়েও গড়ে উঠে ছিল। কুড়িগ্রামের ৪০/৪৫ বছর বয়সি বিহারি কনস্টবল জনাব আব্দুল হাই চাচার দুই সন্তান নিয়ে ছোট সংসার। তাদের ভাড়া বাসায় আমার মায়ের যাতায়াত ছিল। যদিও আব্দুল হাই চাচার দুই সন্তানেরা বাবাকে হাঁস দাদা ডাকতো (বাবা শাক-সব্জীর বাগান ও উন্নত জাতের মুরগী পালনের সাথে কিছু রাজ হাঁসও পালতেন)। বাবা তাঁকে স্থায়ী বাসস্থানের জন্য ১৯৬৭ সালে রংপুর জেলা প্রশাসক, জনাব হেদায়েত আহমেদ সিএসপি (আমাদের মামা) এর কাছে সুপারিশ করে পুরাতন কুড়িগ্রাম শহরের সবুজ পাড়ায় প্রায় ৮ শতাংশ খাস জমির বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। যেখানে বিহারি কনস্টবল জনাব আব্দুল হাই চাচা ১৯৬৮ সালেই তাঁর নিজ কাঁচা বসত বাড়ীটি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অবাঙ্গালী পরিবারের অনেকেই স্কুলে আমাদের সহপাঠী ছিল। তাছাড়া অন্যান্য ধর্মের মানুষজন সারা বাংলাদেশেই বহুযুগ ধরেই নিরাপদে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করে আসছেন। সৈয়দপুরে আমরা দুই বছর ছিলাম ও আমাদের প্রায় সব প্রতিবেশী ছিল বিহারি। সেখানে পাসের বাসার বিহারী প্রতিবেশী জনাব আবদূর রহিম উদ্দিন ছিলেন সৈদপুর রেলওয়ে ওয়ার্কসপের কর্মচারী যাদের সাথে আমাদের অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাঁর পরিবারের ২বছরের ছোট ছেলে নাদিম প্রায় সারাদিনই মা ও আমাদের সাথেই কাটাত। ১৯৭০ এর অক্টেবরে ঢাকায় আমাদের বড়বোন তারিফা আখতার চৌধুরীর বিয়েতে জনাব আবদূর রহিম উদ্দিন তাঁর বড় মেয়ে শাহ্ নেওয়াাজ ও ছেলে শামীমকে নিয়ে ঢাকায় বিয়েতে যোগ দিয়েছিলেন। ভাষা, ধর্ম, বা জাতীর গন্ডি পেড়িয়ে আমরা তাঁদের সকলের সাথে নানা পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে আনন্দ ও দুঃখ ভাগাভাগি করেছি। আমাদের বাবা ও মা উভয়েই ছিলেন উন্মুক্ত মানসিকতার মানুষ এবং সেভাবেই আমরা বড় হয়েছি। ১৯৭০ সালের দেশব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় আমরা সৈয়দপুরে। সৈয়দপুর মূলত একটি রেলওয়ে শহর, এখানে একটি রেলওয়ে ওয়ার্কশপ আছে এবং জন সংখ্যার ভিত্তিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে খুলনা শহরের পরেই সৈয়দপুরের স্থান। জন সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ, তবে প্রায় ৫৫% ই অবাঙ্গালী ও রেলওয়েকর্মচারী বা রেলওয়ের সাথে পরোক্ষ ভাবে যুক্ত ও ব্যবসায়ী। এছাড়া এখানে আছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একটি বড় সেনানিবাস। আমি এবং চাচাতভাই হাসনাত সৈয়দপুর হাই স্কুলে ও তোফায়েল সৈয়দপুরের মোহাম্মদ আলী জিন্না কলেজে। বাবা পুলিশ অফিসার তাই আমরা কখনোই সরাসরি কোন রাজনৈতিক দল বা কর্মকান্ডে জড়িত ছিলাম না, কিন্তু আমাদের অনেক বন্ধু ও সহপাঠী রাজনীতিতে জড়িত। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনীতি নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলাম। এ ব্যাপারে বড় ভাই তোফায়েল (যাকে আমরা ছোট ভাই বলে ডাকতাম) কলেজের ছাত্র হিসাবে স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশী সচেতন ও কিছু অংশ গ্রহণ ছিল যা বাবা জানতেন। কারণ পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে বাবা শহরের ও ছাত্রদের সম্বন্ধে অনেক খবরই তোফায়েল মারফতই পেয়ে যেতেন। যদিও বাবাকে এব্যাপারে সাহায্য করতে তাঁর অধিনে বেশ কয়কজন গোয়েন্দা পুলিশ কর্মচারী ছিল। ১৯৬৯ এর দুর্বার গণআন্দোলনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৬৯-এর ২৫মার্চে আবার সামরিক আইন জারী করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশবাসির কাছে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাবার লক্ষ্যে ১৯৭০ এর মধ্যে একটি সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রæতি দেন। ১৯৭০ সালে সরকার দেশে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালাবার অনুমতি দিলে সারা পাকিস্তানে ছোট বড় সকল রাজনৈতিক দলগুলি তাঁদের কর্মকান্ড আবার পূর্ণ উদ্যোমে শুরু হয়। যার ঢেউ বাঙ্গালী-বিহারী বসতির শহর সৈয়দপুর, লালমনিরহাট বা অন্যান্য গুলোতেও। আমাদের সৈয়দপুর হাই স্কুলের সামনে বিরাট ফুটবল খেলার মাঠ আর মুল স্কুল ভবন ও তাঁর সামনে সকাল বিকাল ছাত্রদের জমায়েত হবার মাঠ মাঝে দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে চলে চলে যাওয়া রংপুর-দিনাজপুর সড়ক দ্বারা বিভক্ত। আমাদের ঐ স্কুলের ফুটবল মাঠেই প্রায় সকল বড় রাজনৈতিক দলই সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের জনসভায় লোক সমাগম ছিল মনে রাখবার মতো। সেদিনের জনসভার মুল আকর্ষণ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান। ১৯৬৯ সালে যদিও তাঁকে আমি প্রথম বার দেখি কিন্তু সেবার তিনি কোন জনসভা করেন নাই। আমরা স্কুলের সামন থেকে তাঁর গাড়ীর সাথে সাথে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটেছিলাম। শেষে বিশাল জনগন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় তাঁকে বাধ্য হয়েই গাড়ী থেকে বের হয়ে ঐ গাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে স্বল্প সময়ের ভাষণ দেন। তাতেই জনগন উল্লাসিত হয়। কারণ আমার মতো অনেকেই তাঁকে শুধু একবার দেখতেই এসেছিল। অন্যদিকে চীনপন্থি পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি “ভোটের আগে ভাত চাই” শ্লোাগান দিয়ে এই নির্বাচন বয়কট করলে পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের পক্ষেই যায়। পূর্ব পাকিস্তানে তখন আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করার মতো তেমন কোন শক্তিশালী বড় দল রইল না। যদিও ভাসানি পন্থী অনেক ন্যাপ নেতা নিজ উদ্দ্যোগে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অন্য দলগুলো ছিল বহুভাগে বিভক্ত ও প্রায় নির্জীব। একমাত্র পাকিস্তান জামিয়ত-ই-ইসলাম যা শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগের উপরই নির্ভরশীল। তারা দেশের মানুষের বাস্তবতা থেকে বহুদূর, কিন্তু উর্দু ভাষীদের(বিহারি) মধ্যে তার বেশ প্রভাব আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচন পূর্ব এইসব ছোট বড় জনসভা যদিও ছিল শান্তিপূর্ণ কিন্তু বাঙ্গালী-বিহারী জনগেনের মধ্যে যথেষ্ট অনাস্থার সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা উর্দু ভাষার সাথে বাংলা ভাষাকে ও ‘রাষ্ট্র ভাষা’ করার দাবীকে পূর্ব পাকিস্তানের বিহারী জনগন কখনোই সমর্থন দেয় নাই। বর্তমান বাংলাদেশের জনগনের হয়ত সেই সময়কার পরিস্থিতি বুঝতে কিছু অসুবিধা হবে, কারণ বাংলাদেশের গুটি কয়েক বড় শহরের কয়েকটি বিহারী বসতি ছাড়া সারাদেশ এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত ছিল। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছিল বাঙ্গালী-বিহারী দূরত্ব ততোই বাড়ছিল। শুধু সৈয়দপুর শহরে বিহারী ভোটার অধিক্যের কারণে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আমাদের পরিচিত ডাক্তার জনাব জিকরুল হকে একরকম বিপরীত স্রোতের সাথে চলতে হয়। কারণ বিহারী ভোটারগণ তাঁকে ভোট দেবেনা। ১২ই নভেম্বর ১৯৭০-এ বাংলাদেশের উপকূলে শতাব্দির ভয়াল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে ও লক্ষ প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয় ক্ষতি হয়। তবে সারাদেশ স্বাভাবিক থাকায় ১৯৭০-এর ৭ডিসেম্বরে শুধু ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা ছাড়া সারা পাকিস্তানে সফল ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়। সৈয়দপুরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আমাদের পরিচিত ডাক্তার জনাব জিকরুল হক তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দী জামিয়ত-ই-ইসলামের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন, যাদের মূল ছিল শহরে বাইরের গ্রাম অঞ্চল । দুর্ভাগ্যজনক ১৯৭১ সালের ২৫মার্চের পর স্থানীয় বিহারীরা তাঁকেসহ পরিবারকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে ও প্রতিশোধ নিতে গ্রাম অঞ্চলে গণহত্যা, লুটতরাজ অগ্নিসংযোগসহ নানা মানবতা বিরোধী অপরাধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্তে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, মোট ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানেই ১৬২ আসনের ১৬০টি আসনে জয় লাভ করে সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। পরবর্তী সংখ্যায় ‘উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা ৭১ এর স্মৃতি’ পর্ব-২