লালমনিরহাট বার্তা
বেতন বোনাস শ্রমিক পাবে তো?
লালমনিবার্তা অনলাইন ডেস্ক : May 10, 2021, 5:57:19 PM সময়ে

বেতন বোনাস শ্রমিক পাবে তো?

ঈদের বাকি আছে মাত্র কটা দিন। এরই মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন-বোনাস পেয়ে গেছেন। বেসরকারি চাকরিজীবীদের সবাই না পেলেও অনেকেই হয়তো পেয়েছেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, করোনার মারাত্মক ছোবল অনেকটাই পঙ্গু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্যকে। কিন্তু শ্রমিকরাই ছিল এবং আছেন মহাবিপদে। তাদের বোনাস তো দূরের কথা, মূল বেতনই অনেকেই পাননি। তবে আরও যেসব কথা বলতে হবে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতকেই সরকার দিয়েছে সবচেয়ে বড় প্রণোদনা। গত বছর মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব এবং প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল সে সময় পোশাক তৈরির কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন পোশাক কারাখানার মালিকরা সরকারের কাছে প্রণোদনার দাবি তুললে সরকার পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য প্রথমেই দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জে তিন মাসের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার আওতায় সেই মালিকের ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে কারখানা বন্ধ করেন। কিন্তু এর পরের ঘটনা আমরা সবাই দেখেছি। কদিন পরই গোপনে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ভয় দেখিয়ে মেসেজ পাঠানো হলে অনেকেই পায়ে হেঁটে, ড্রামের ভেতর লুকিয়ে এসেছিলেন শুধু ‘চাকরি’ নামের এক সংগ্রামকে ঠেকা দিয়ে রাখতে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়তো অনেকেই করতে পারেননি। করোনার প্রথম ছয় মাসেই শুধু গত বছর পোশাক খাত থেকেই প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক কোনোভাবে টেনেটুনে নেওয়া জীবনের অবলম্বন সেই চাকরিটুকু হারিয়েছেন, যেটিকে টিকিয়ে রাখতে শেষ চেষ্টা করে দুদিন ধরে হেঁটে হেঁটে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এসেছিলেন। তারা কেমন আছেন? কী করছেন? কিংবা আদৌ টিকে থাকতে পেরেছেন কিনা এই পৃথিবীতে সেটির খোঁজ হয়তো খুব বেশি লোকজন রাখেনি। কারণ তাদের জীবন-মৃত্যু কোনোটিরই গুরুত্ব নেই সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে। আর যারা চাকরিতে টিকে আছেন তারাও যে সবাই বেতন-বোনাস পেয়েছিলেন তা নয়। অন্যদিকে সেই প্রণোদনার কী হলো? তা আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছিল। শুধু টাকাই নয়, বেড়েছে ঋণ পরিশোধের সময়ও। প্রথমে এই সময়সীমা ছিল ছয় মাস। পরে পোশাক শ্রমিক মালিকরা সেটির সময়সীমা দেড় বছর বাড়ানো হয়। আশঙ্কা- এটি আরও বাড়বে এবং বাড়তেই থাকবে। করোনাকালীন বছরটি বাদ দিলে এই খাতে শ্রমকিদের কী চিত্র দেখি? এখন না হয় করোনার দোহাই দিয়ে অনেক কিছু ক্ষমা করা হচ্ছে কিন্তু এর আগের চিত্রও কিন্তু মোটেই সুখকর নয়। প্রতিবছর যখন ঈদের আগে বিভিন্ন শপিংমলে ঈদের কেনাকাটার জন্য মানুষের ঢল নামে, তখন অনেক পোশাক কারখানার শ্রমিকরা থাকেন রাস্তায়। প্রতিবছরই এই ঈদের সময় এই শ্রমিকদের বকেয়া বেতন এবং বোনাসের জন্য আন্দোলন করতে হয়, কখনো কখনো যেতে হয় রাস্তা অবরোধের মতো সিদ্ধান্তের দিকে। মনে হতে পারে এই ঈদকে ঘিরেই বোধহয় তাদের এই দাবি-দাওয়ার বিষয় ঘটে। আসলে বিষয়টি হলো আমরা সবাই জানি শ্রমিকের জীবনে তিন দিন ছুটি খুব সহজ বিষয় নয়। একমাত্র ঈদেই হয়তো এই ছুটি মিলে। সেখানে তার পরিবার এবং কখনো কখনো হয়তো ছোট শিশুটি অপেক্ষা করে একটি নতুন জামার। যখন সে বুঝতে পারে তার সেই ছোট্ট সাধটুকু পূরণ হচ্ছে না তখন সে বাধ্য হয়েই নামে আন্দোলনে। এই চিত্র প্রতিবছরের, প্রতিটি ঈদের। তবে এবারের ঈদের আগে আরও কৌশলী মালিকপক্ষও। আগের প্রণোদনার টাকা ফেরত দেওয়ার সময় পেছানোর পাশাপাশি এই বছরও শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে আবারও সরকারের প্রণোদনা চেয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকরা। চালাচালি হচ্ছে চিঠি। ইতোমধ্যেই অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে আবারও প্রণোদনার দাবি জানিয়েছে পোশাক ও বস্ত্র খাতের তিনটি সংগঠন। এই প্রণোদনা যে শুধু বিজিএমইএ চেয়েছে, তা নয় নয়। আরও প্রণোদনা চেয়েছে বিকেএমইএ ও বিটিএমইএ। তারাও সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। তাদের চাওয়ার তালিকায় আরও অনেক কিছু যুক্ত আছে, যার মধ্যে রয়েছে সাড়ে চার শতাংশ সুদে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা তহবিল থেকেও পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ চেয়েছেন। তাই তাদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব যতখানি লম্বা ঠিক ততটাই ফ্যাকাসে জীবন শ্রমিকদের। কারণ তারা তাদের শ্রম অভিজ্ঞতায় জেনে গেছে, এই বছরও তাদের বকেয়া বেতনের জন্য আন্দোলন করতে হবে। সেই আন্দোলনে অনেকেই হয়তো ছাঁটাই হবেন। আবার এই ছাঁটাই হওয়ার ভয়ে অনেকেই বেতন না পেয়েও আন্দোলন বা বকেয়া বেতনের দাবিটি ঢোকের সঙ্গে গিলে ফেলবেন। কারণ বেতন না দিলেও আশায় থাকবেন একিদন বেতন হবে। একদিন ধারদেনা করে চললেও একদিন তিনি বেতন পাবেন। কিন্তু সব সময়ের মতো ঈদের দিনটি যত ঘনিয় আসে ততই যেন শঙ্কা বাড়ে। এই শ্রমিকরা আরও জেনে গেছে, যেসব মালিক গত বছর প্রণোদনা পেয়েও তাদের বেতন-বোনাস দেননি সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি কাজহারা শ্রমিকদের কোনো ধরনের ক্ষুদ্রঋণ বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করেনি। প্রণোদনা তো দরকার তাদেরই বেশি। অথচ সব সময় দুর্যোগে পোশাক মালিকদের প্রণোদনা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়, অন্য সময়ে যাদের লাভের ভাগ শ্রমিক কখনো পায় না। অথচ হওয়ার কথা ছিল ভিন্ন, পাওয়ার কথা ছিল শ্রমিকের, যাদের শ্রমের ওপর টিকে থাকছে একটি দেশের অর্থনীতির চাকা। কিন্তু সোজা-সাদা হিসাব-নিকাশগুলো কেমন করে যে পাল্টে যায়! শ্রম থেকে ছিটকে পড়ে শ্রমিক, অন্যদিকে বারবার প্রণোদনার টাকা পায় মালিকরা। তাই এবারের ঈদে অন্তত এই পোশাক শ্রমিকদের সব বকেয়া বেতন এবং বোনাস প্রদান করুন। এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ে গুরুত্ব এই মুহূর্তে জরুরি। আমাদের এই জারি থাকা লকডাউনে অনেক কিছু বন্ধ থাকলেও এই পোশাক শিল্প খাত বন্ধ নেই। সে ক্ষেত্রে এই শ্রমিকদের করোনোর টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করারও জরুরি। আমরা জানি আমাদের দেশে ইতোমধ্যে যারা টিকা পেয়েছেন তারা সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত। দরিদ্র মানুষরা এখনো এই টিকার আওতায় নেই। জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকাটাই যখন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়, সেখানে হয়তো করোনার টিকা নিয়ে তারা বিচলিতও নন। আর এসবেরই সুযোগ নিচ্ছেন অনেকেই। তাই তাদের বেতন নিয়ে ‘দিব’-‘দিচ্ছি’র গড়িমসি করা যায়। আন্দোলন করলে পাখির মতো গুলি করার ভয় দেখানো যায়, ইচ্ছেমতো ছাঁটাই করা যায়। অন্যপক্ষ এতসব মেকানিজমের বিপরীতে কুঁকড়ে থাকে। তাদের একমাত্র ভরসার জায়গা থাকে শুধু ট্রেড ইউনিয়নগুলো। সেগুলো যে কার্যত খুব বেশি কিছু করতে পারে তা নয়। অথচ এই উপমহাদেশেই ছিল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ট্রেড ইউনিয়ন যা আদমজী পাটকলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। এ দেশে শ্রম এবং শ্রমিকের ইতিহাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নথিভুক্ত নয়। তাই সেই ইতিহাস ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যায় শ্রমিক মূল্যায়নের রাষ্ট্র এবং মালিক পক্ষের চর্চিত তরিকার মধ্য দিয়ে। যে কারণে মাসের পর মাস শ্রমিকের বকেয়া বেতন নিয়ে রাষ্ট্র কোনো প্রশ্ন করে না। তাজরীন, রানা প্লাজা কিংবা সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ঘটনায় এত এত শ্রমিক মারা গেলেও কোনো মালিকের এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। এতকিছুর পরও শ্রমিক শুধু চায় তার ন্যায্য বেতন, পাবে তো? ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়