লালমনিরহাট বার্তা
স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশীজনের ভূমিকা
মো. মামুন অর রশিদ | ২৭ জুন, ২০২৪, ১১:৫৬ AM
স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশীজনের ভূমিকা

স্মার্ট বাংলাদেশ শুধুই কি একটি স্লোগান? না, স্মার্ট বাংলাদেশ শুধু স্লোগান নয়,  এটি একটি রূপকল্প, যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত আগামীর বাংলাদেশ। আরেকটু সহজ করে বললে স্মার্ট বাংলাদেশ হলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আধুনিক রূপ। ২০২২ সালের ১২ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই বলিষ্ঠ ঘোষণার আলোকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের কার্যক্রম। স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি এই চার স্তম্ভের উপর স্বগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হবে আমাদের স্বপ্নের স্মার্ট বাংলাদেশ।

কেমন হবে এই স্মার্ট বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা? সহজভাবে বললে স্মার্ট বাংলাদেশ হলো বৈষম্যহীন ও অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর এক বাংলাদেশ, যেখানে প্রান্তিক ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী থাকবে না; সকল নাগরিকসেবা থাকবে হাতের মুঠোয়; টাকা ও কাগজের ব্যবহার কোনোটাই থাকবে না; দুর্নীতি থাকবে শূন্যের কোঠায়; জনগণের দোরগোড়ায় থাকবে স্বাস্থ্যসেবা; চরম দারিদ্র্য থাকবে না; উন্নয়ন হবে টেকসই; পাঠদান প্রক্রিয়া হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও আনন্দের; সমাজব্যবস্থায় সুযোগের সমতা নিশ্চিত হবে; মূল্যস্ফীতি থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে এবং মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। 

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশীজন কারা? এককথায় বললে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশীজন হলেন বাংলাদেশের সকল নাগরিক। তবে এই অংশীজনকে সরকার, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক, শিক্ষক, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, সাধারণ জনগণ— এ রকম কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যেতে পারে। 

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল পরিকল্পনাকারী, সমন্বয়কারী, বাস্তবায়নকারী তথা মূল অংশীজন হলো সরকার। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার ইতোমধ্যেই একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই টাস্কফোর্সের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বে রয়েছেন। এই টাস্কফোর্স স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও দিকনির্দেশনা প্রদানের দায়িত্ব পালন করছে। ২০৪১ সালের মধ্যে কীভাবে স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জিত হবে, সে জন্য  সরকার ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১’ প্রণয়ন করেছে। সরকারের অংশ হিসাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছেন। 

স্মার্ট বাংলাদেশের অন্যতম অংশীদার হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। ভোগান্তি ছাড়া জনগণের নিকট দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেবা পৌঁছানোর জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ দায়িত্বপ্রাপ্ত। স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে শতভাগ নাগরিকসেবা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। এর জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে প্রথমে নিজেকে স্মার্ট করতে হবে এবং নাগরিকসেবা সহজীকরণে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। একইসঙ্গে নাগরিকগণকেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের আরেক প্রভাবশালী অংশীজন হলেন সাংবাদিক। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, গণমুখী ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের রয়েছে কার্যকর ভূমিকা। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলো গণমাধ্যম। আর সাংবাদিকগণ হলেন এই চতুর্থ স্তম্ভের পরিচালক। সাংবাদিকগণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রচারকৌশলের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রগতি, করণীয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করছেন। তবে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রত্যেকটি মিডিয়ার একটি নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রিন্ট মিডিয়া স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে করণীয়, চ্যালেঞ্জ, স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে সফলতার গল্প প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করতে পারে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াও এ-সংক্রান্ত ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করতে পারে। গণমাধ্যমের আরেকটি বড়ো দায়িত্ব হলো জনগণকে ডিজিটাল সেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং অভ্যস্ত করা। এছাড়া প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গণমাধ্যমকে আরও বেশি আধুনিক হতে হবে এবং একই সঙ্গে সাংবাদিকগণকেও স্মার্ট হতে হবে। 

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষকগণের রয়েছে কার্যকর ভূমিকা। শিক্ষককে প্রথমেই নিজেকে স্মার্ট শিক্ষক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু নিজে স্মার্ট শিক্ষক হলে হবে না, শিক্ষার্থীকেও স্মার্ট নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ে ধারণা প্রদানের পাশাপাশি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে করণীয় বিষয়েও অবহিত করতে হবে।  

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম অংশীদার হলো সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। সমাজের যে-কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টিতে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো সাধারণ জনগণ। স্মার্ট সেবা গ্রহণের জন্য নাগরিককে অবশ্যই স্মার্ট হতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশের একটি ভিত্তি হলো স্মার্ট নাগরিক। ‘স্মার্ট নাগরিক’ মানে ‘আমিই সমাধান’। কারণ, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন স্মার্ট নাগরিক নিজেই তাঁর সমস্যা সমাধান করতে পারেন। স্মার্ট নাগরিককে শুধু সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হলে হবে না, তাঁকে অবশ্যই তথ্য সাক্ষর ও ডিজিটাল সাক্ষর হতে হবে। 

তবে এ কথা সত্য যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার হবে। এর ফলে মানুষের কায়িক পরিশ্রম কমে যাবে এবং মানুষ অতিমাত্রায় যন্ত্রনির্ভর হয়ে যাবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে যে সকল প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে : ক্লাউড কম্পিউটিং, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লক চেইন প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, উন্নত মানের জিন প্রযুক্তি, সাইবার সিকিউরিটি, রোবোটিক্স প্রভৃতি। এসব প্রযুক্তি যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ আরও সহজ হবে। 

তবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। এর মধ্যে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো, দেশের নিরক্ষর ও প্রযুক্তিজ্ঞানহীন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী বেকার হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে দেশের শতভাগ জনগণকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। 

দেশের কোনো নাগরিককে পিছনে ফেলে স্মার্ট বাংলাদেশে বিনির্মাণ সম্ভব নয়। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশীজন যেহেতু দেশের সকল নাগরিক, তাই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সকল নাগরিককেই আন্তরিকভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সরকার ও জনগণের মধ্যে সমন্বয়ের সেতুবন্ধ রচনার মাধ্যমে ২০৪১ সালের আগেই স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে— এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক : বিসিএস তথ্য ক্যাডার কর্মকর্তা এবং সিনিয়র তথ্য অফিসার হিসাবে আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রংপুর-এ কর্মরত

এই বিভাগের আরও খবর