লালমনিরহাট বার্তা
কোরবানির তাৎপর্য ও শিক্ষা
ড. ইকবাল কবীর মোহন : Jul 20, 2021, 6:46:34 PM সময়ে

কোরবানির তাৎপর্য ও শিক্ষা

কোরবানির দিন আল্লাহর কাছে বনি আদমের পশু কোরবানি অপেক্ষা অন্য কোনো আমল বেশি পছন্দনীয় নয়। কিয়ামতের দিন কোরবানীকৃত পশুর পশম, খুর ও শিংসহ উপস্থিত হবে। (তিরমিজি)

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদুল আজহা অন্যতম। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ এই উৎসব পালিত হয়। ধনী-গরিব-নির্বিশেষে বিশ্বের মুসলমানরা আনন্দঘন পরিবেশে ঈদুল আজহা পালন করে। এটি মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন মুসলমানরা খুশির এক মোহনায় এসে মিলিত হয়। ঈদুল আজহার দিন মুসলমানরা সকালে ওয়াজিব নামাজ আদায় করে। তারপর পশু কোরবানি করে। ঈদের নামাজ আদায় ও কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ লাভ করে। ঈদুল ফিতরের আমেজ কাটতে না কাটতে আসে ঈদুল আজহা। এই ঈদের বড় কাজ হলো কোরবানি করা।

কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত : নেক আমলগুলোর মধ্যে কোরবানি একটি বিশেষ ইবাদত। কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হয়। আল্লাহর আদেশ থাকার কারণে মুসলমানরা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য এই আদেশ পালন করে। পশু কোরবানি করা মুখ্য বিষয় নয়; বরং আল্লাহভীতিই এখানে মুখ্য বিষয়। আল্লাহ পাক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এর গোশত ও রক্ত, পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)

যে কোরবানির সঙ্গে তাকওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আবেগ জড়িত নেই, আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই কোরবানির কোনো মূল্য নেই। তাই আল্লাহ তাআলা কোরআনে আরো বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২৭)

কোরবানি করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কোরবানি করে না, তাদের পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ)

কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে জায়িদ ইবন আকরাম (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এ কোরবানি কী? তিনি বলেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। তাঁরা (আবার) বললেন, এতে আমাদের কী কল্যাণ নিহিত আছে? তিনি বলেন : এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি আছে। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, বকরির পশমেও কি তাই? জবাবে তিনি বলেন, বকরির প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি আছে।’

অন্য এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে মুমিন ব্যক্তি প্রশান্ত হৃদয়ে হাসিখুশি মনে সওয়াবের আশায় কোরবানি করবে, আল্লাহ তাআলা তার এ কোরবানিকে জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষার জন্য ঢালস্বরূপ বানিয়ে দেবেন। (ইবনে মাজাহ)

আরেক হাদিসে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন আল্লাহর কাছে বনি আদমের পশু জবেহ অপেক্ষা অন্য কোনো আমল বেশি পছন্দনীয় নয়। কিয়ামতের দিন কোরবানীকৃত পশুর পশম, খুর ও শিংসহ উপস্থিত হবে।’ (তিরমিজি)

কোরবানির শিক্ষা ও করণীয় : পবিত্র ঈদুল আজহা প্রতিবছর আমাদের কাছে ঘুরেফিরে আসে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশা করে। এই কোরবানির শিক্ষা কী, তা আমাদের জানা দরকার। মনে রাখতে হবে, কোরবানি শুধু পশু জবেহ করা নয়, কোরবানি হলো নিজের ভেতরের পশু সত্তাকে জবেহ করা। তার মানে মনের সব কুপ্রবৃত্তিকে খতম করা। কোরবানির গোশত পেয়ে গরিব-দুঃখী খুশি হয়। কোরবানি করার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর আনুগত্য ও  নির্দেশ মানার শিক্ষা গ্রহণ করে। কোরবানির দিন মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে মহামিলনে মিলিত হয়। এদিন ধনী-গরিব কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সবাই সাম্য, ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে। এতে সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি হয়। তাই কোরবানি যাবতীয় আহকাম মেনে খোদাভীতির মানসিকতা নিয়ে কোরবানি করা দরকার। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহর দরবারে আমাদের কোরবানি কবুল হবে। এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সমর্থ্য হব।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, বর্তমানে কো-অর্ডিনেটর, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড