লালমনিরহাট বার্তা
উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি
পারভেজ এলাহী চৌধুরী : May 26, 2021, 6:17:25 PM সময়ে

উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি

নির্বাচন বানচাল ও ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র  ১ লা মার্চ ১৯৭১ - সেদিন ছিল সোমবার

পর্ব-৪
আজ আমাদের লালমনিরহাট আসার ৫৮ দিন হল। অন্যান্য দিনের মতই উত্তর বঙ্গের শীতের শেষে শুকনা  মৌসুম। আমি ছাড়া সবাই যে যার স্কুলে ও কলেজে। আমার জন্য বাড়িতে একা আগামী এস.এস.সি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া, কিছুটা অসুবিধা হলেও করার কিছুই নাই। লালমনিরহাট স্কুলের কাউকে আমি জানিনা যারা এই বছর আমার সাথে পরীক্ষা দেবে। লালমনিরহাট আসার আগ-পর্যন্ত গত বছর সৈয়দপুরে প্রায় ৬ মাস মগুল স্যার নামের একজন নিবেদিত প্রান ও সকলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কাছে সপ্তাহের কয়কদিন ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পড়াশুনা করেছিলাম। কারণ পরিবারের অন্যান্য ভাই ও বোনদের মত আমি কোন দিনই ভাল ছাত্র ছিলাম না । ছবি আঁকা বা মিস্ত্রীর কাজে আমার উৎসাহ অনেক বেশী যা আজও আছে ।
মগুল স্যার ছিলেন সৈয়দপুরের নামকরা প্রাচীন “কিশোরী মোহোন বালিকা বিদ্যালয়” এর একজন সিনিয়র শিক্ষক। যার ছিল দীর্ঘ দিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। আমাদের স্কুল থেকে কিছু পূর্বে সৈয়দপুর-রংপুর সড়কের সংগেই তার বাসা। সন্ধ্যার পর সাইকেলে চলে যেতেম তার বাসায়। সেখানে আমার মতই কিছু অভাগা ছাত্রকে তিনি অতি যতœ সহকারে সাহায্য করতেন। তাঁর বড়ির সাথেই ছিল একটি পেট্রোল পাম্প ও বড় বাস-ট্রাকের  মেরামত গ্যারাজ, তাই অনেক সময় আমি বিকালেই চলে যেতাম সেই গ্যারাজে ও বসে তাদের নানা কাজ  দেখতাম, কোন সময় সাহায্য করতাম। যতক্ষন না অন্য ছেলেরা আসতো।
বাবা নিয়ম মাফিক আজ ভোরের ট্রেইনে কমর উদ্দিন চাচাকে নিয়ে রংপুরে গেছেন এবং সম্ভবত রাতের  ট্রেইনে ফিরবেন। সেকালে রেল ছিল একমাত্র দূরপাল্লার যোগাযোগ মাধ্যম এবং তা চলত খুবই সময় মাফিক ও নিয়মিত। সবার কাছে ঘড়ি ছিলনা তবে রেলগাড়ির শব্দ শুনে আমরা সময় বুঝতে পারতাম। পার্বতীপুর থেকে  ট্রেইন রংপুর-কাউনিয়া-তিস্তা-লালমনিরহাট-পাটগ্রাম-বুড়িমারি পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিঃ মিঃ পথ । আবার লালমনিরহাট থেকে উত্তরে ৮ কিঃ মিঃ মোগলহাট সীমান্ত পর্যন্ত। তবে রংপুর-লালমনিরহাট দুই ঘন্টার পথ। আবার ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি চালু হয় তিস্তা জংশন থেকে নতুন কুড়িগ্রাম-উলিপুর-চীলমারি বন্দর রেল যোগাযোগ।
বিকালের আগেই হাসনাত ও ছোট তওফিক বাসায় চলে এলো, তারা জানালো স্কুল দুপুরের পরেই ছুটি হে গেছে, ঢাকায় গন্ডোগোল হয়েছে ও হরতাল শুরু হয়েছে। আমি জানতাম ঢাকায় সেদিন ক্রিকেট খেলা চলছে, যদিও সেকালে আমার ঐ খেলায় তেমন আগ্রহ ছিল না । আমরা ফুটবল খেলা নিয়েই বেশী মত্ত ছিলাম ও নিজেও খেলতাম, তাতে প্রচুর মারামারিও হত যা মাঝে মধ্যে শহরেও ছড়াত। কিন্তু ক্রিকেট খেলাতে মারামারি শুনি নাই কারণ তা ছিল সমাজের উচু স্তরের খেলা। হাসনাতের কথায় বিষয় খেলা নয়, আজ দুপুরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নাকি রেডিওতে ভাষণ দিয়েছে তাই নিয়ে ছাত্র বিক্ষোভে স্কুল ছুটি। বাসায় একা পড়াশুনায় ব্যাস্ত (!) থাকায় রেডিও শুনা হয় নাই ।
তাড়াতাড়ি রেডিও খুলে বিস্তারিত জানার সময়েই রাস্তায় মিছিল ও শ্লোগানের আওয়াজ শুনা গেল। বাড়ির পাসের লালমনিরহাট হাইস্কুলের ছাত্ররা এর মাঝেই রাস্তায় নেমে গেছে। মজার কথা থানার রাস্তার অপরদিকেই সেই স্কুল। বুঝলাম গত ভাষা দিবস ও তার পর দিন-দুই বিহারি-বাংগালি হাংগামার পর এখন বাবা ও বাকি পুলিশ বাহিনির দম নেবার ফুরসত হবে না। বড় ভাই তোফায়েল যাকে আমরা তিনজন "ছোট ভাই" ডাকি বাসায় এলো সন্ধ্যার আগে আগে। আজ দুপুর ১-০০ টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে আগামী ৩রা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ আধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। আমাদের কাছে যা এতোদিন ছিল আশংকা আজ তা নিশ্চিত হলো যে পাকিস্তানের সামরিক সরকার নির্বাচিত জন প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেনা এবং এটা তারই প্রথম প্রমান।
গত মাসের ২৬ তারিখ করাচীতে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর দীর্ঘ বৈঠক ও ভোজ সভার পর ইয়াহিয়ার এই ভাষণ ও সিদ্ধান্ত এটাই প্রমাণ করে যে তিনি বার বার ভুট্টোর পরামর্শে ও ভুট্টোর স্বার্থ রক্ষায় এই প্রকার হটকারি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাচনের পর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় তার প্রেসিডেন্ট হাউসে মুজিবের সাথে স্বল্প সময়ের সরকারি নিয়ম মাফিক (চৎড়ঃড়পড়ষ) বৈঠক করেছেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে সরকারি নিয়ম (চৎড়ঃড়পড়ষ) ভেংগে লারকানায় ভুট্টোর নিজ বাড়িতে (প্রাসাদ) তিন দিনের অতিথি হন ও হাস শিকারের বাহানা করে ষড়যন্ত্রে তৈরিতে লিপ্ত হন। (পরবর্তী কালে প্রমানিত হয় যে লারকানাতেই ইয়াহিয়া-ভুট্টো জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র করেন - যা “লারকানা ষড়যন্ত্র” নামে পরিচিত)। পূর্ব পাকিস্তানের আজকের এই বিক্ষোভ  শতভাগ যৌতিক এবং জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক বিক্ষোভে অংশ গ্রহন ছিল শতস্ফুত ও স্বাভাবিক।
ঢাকায় কারফিউ জারী করা হয়েছে এবং পাকিস্তান রেডিওর রাতের খবরে আমরা আরও একটি দুঃসংবাদ পেলাম এবং তা হল পূর্ব পাকিস্তানের মোটামুটি গ্রহনীয় গভর্নর ও উপ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক রিয়ার এডমিরাল এইচ এম আহসানকে অপসারন করে পর্ব পাকিস্তান সামরিক বাহিনির জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেদিন এর কারণ আমরা না বুঝলেও বাবা বুঝেছিলেন। যা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়া খানের সামরিক নিয়ন্ত্রন আরো কঠোর করা । যদিও সাধারন নির্বাচনের আগে থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাছাড়া এই পরিবর্তনের প্রয়োজন হল কেন?
কমর উদ্দিন চাচা রাত প্রায় ১০টার দিকে মালপত্রসহ একটি রিকশা নিয়ে বাসায় এলেন। তার সংগে রংপুর পুলিশ লাইন থেকে আনা আমাদের পরিবারের জন্য মার্চ মাসের পুলিশ রেশন সামগ্রী। সেকালে পরিবারে সদস্য অনুযায়ী চাল, ডাল, আটা, তেল, ও কিছু বনস্পতি ঘী (ডালডা) মাসিক ভিত্তিতে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যেত। বরাবরের মত কমর উদ্দিন চাচা তার নিজের ও আমাদের রেশন সামগ্রী নিয়ে আসেন। বাবা ষ্টেশনের জি.আর.পি ও লালমনিরহাট থানা হয়ে প্রায় মধ্যরাতে বাসায় এলেন। তার চাকুরি জীবনের শেষের দিকে শহরের ও দেশের এই বহুমুখি সমস্যা তাকে সহজেই অনেক বেশী ক্লান্ত করে ফেলেছে।
শহরের ও রেল শ্রমিক কর্মচারীদের গতিবিধির নজর ছাড়াও থানায় পূর্বে আগত কিছু অবাঙ্গালী পুলিশ কনস্টবলদের নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা যা তার জি.আর.পি অবাঙ্গালী কনস্টবলদের মধ্যেও ছড়িয়ে গেছে বলে বাবা নিশ্চিত। যদিও কয়েকদিন পরেই ঐ বাড়তি অবাঙ্গালী কনস্টবলরা রংপুর পুলিশ লাইনে ফিরে গেছে। গোয়েন্দারা যদি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তার আভাস দিতে না পারে তবে দুর্ঘটনা ঘটার পর পুলিশের তা সামাল দেয়া অনেক সময় সম্ভব হয়না। কারন সাধারন জনগনের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে ঘোরাতে উস্কানি দাতার অভাব  নেই। আমরা জানি এটা বাংগালি-বিহারি সমস্যা নয়, এটা সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকারের দাবি।
২রা মার্চ ১৯৭১, মঙ্গলবার - গতকালের মত আজও স্কুল কলেজ বন্ধ তবে আমি ও তওফিক ছাড়া বাসার বাকি দুই ছাত্র অর্থাৎ তোফায়েল ও হাসনাথ যার যার কলেজ ও স্কুলে। আগের দিনের ঢাকার পত্রিকা এখানে পৌঁছাবে প্রায় দুপুর নাগাদ অর্থাৎ সব বাসিখবর, তবুও খবরের সাথে কিছু ছবি থাকে। গতকালের ঢাকার ছবিসহ খবর পড়তে আমাদের আগামী কাল অর্থাৎ ৩ তারিক পর্যন্ত অপেক্ষা করত হবে। বাইরে ছাত্রদের মিছিলের আওয়াজ পাওয়া যায় তাই পড়ায় মন বসে না। রাস্তায় মিছিল ও মিটিং ছাড়া লালমনিরহাট মটামুটি শান্ত।
ঢাকায় কারফিউ জারী রয়েছে, তাই মা ঢাকার খবর জানার জন্য অস্থির যদিও তিনি রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান না কিন্তু আমরা তার কারন জানি। আমাদের দুই বোন ঢাকায় থাকেন। গত অক্টোবরে বড় বোন তারিফার বিয়ে হলে তিনি তার স্বামী জনাব জসিম আহমেদের সাথে ঢাকার কলাবানে থাকেন যা ধানমন্ডির শেখ মুজিবের বাড়ী থেকে বেশী দূরে নয়। তিনি তৎকালীন ওয়াপদার (ডধঃবৎ ধহফ চড়বিৎ উবাবষড়ঢ়সবহঃ অঁঃযড়ৎরঃু) প্রকৌশলী হিসাবে কর্মরত। অন্যদিকে ছোট বোন পারভিন ইডেন কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে থাকার কথা। কিন্তু তাদের বর্তমান খবর জানা নাই, যা জানা আমাদের পরিবারের জন্য অতি জরুরী। ঠিক সেই রকম আমাদের সব বড় ভাই ইসফাক ইলাহি, যিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনিতে কর্মরত এবং পাঞ্জাবের সাকেসরে আছেন তার খবরই বাকি তাও জানা নাই। আমাদের এই সাদামাটা পরিবারটি আজ চার ভাগে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের তিন শহরে ছড়িয়ে আছে। মা, বাবা ও আমাদের সেই সময় কার উৎকন্টা কেমন ছিল, আজ কেউ কি বুঝতে পারবেন?
বিকালে লালমনিরহাট থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাঃ আব্দুর রকিব জায়গীরদার সাহেব বাসায় এলেন। ডাক্তার আব্দুর রকিব জায়গীরদার আমাদের সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার। আমাদের দাদার বাড়ীও বিয়ানিবাযারের শালেশর। তাছাড়া নিজের জন্মভুমি থেকে সুদূর উত্তরবঙ্গে দীর্ঘ দিন বাস করেও নিজের জন্মভুমির ও ভাষা সংস্কৃতির টান আমাদের বাবা ও মায়ের চিরদিন ছিল, যা আজও আমার আছে। সিলেটী ডাক্তার জায়গীরদার সাহেব এর আগেও  বেশ কয়েকবার আমাদের বাসায় এসেছিলেন। ৩০ ঊর্ধ্ব ডাক্তার জায়গীরদার সাহেব তাঁর পরিবারকে সিলেটে রেখে এই শহরে একাই তাঁর সুন্দর সরকারি বাস ভবনে থাকেন যা অনেক সরকারি কর্মচারী আজকাল করে থাকেন। বাবা বাসায় নেই তাই মা সাথে আমরাও তাঁকে আপ্যায়ন করি। মা ও বাবা তাঁর সাথে সিলেটি ভাষায়(!) কথা বলে মানসিক তৃপ্তি পেতেন। এই বিষয় অতি সত্য যে মাতৃ ভাষাই মানুষকে কাছে নিয়ে আসে, অন্য কিছু নয়। তবে সেকালে আমরা ভাই-বোনরা খুব একটা সিলেটী ভাষা বলতামনা, আমাদের ভাষা ছিল রংপুরের মি¯্র। আজকে ডাক্তার সাহেবের আসার কারণ তার মুখের চেহারায় স্পষ্ট! তিনি ভীষণ চিন্তিত ও ভীত, বাবার কাছে এসেছেন পরিস্থিতি বুঝতে বা জানতে। শহর ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তোফায়েলের সাথে তার নানা আলাপ হয়!
সন্ধ্যায় খবর পাওয়া গেল যে আগামী কাল ৩রা মার্চ সারা দেশে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের “জাতীয় সংসদ আধিবেশন” স্থগিত আদেশের প্রতিবাদে হরতাল পালিত হবে এবং বিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পল্টন ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় ভাষণ দেবেন। সে আমলে সকল সরকারি অফিস আদালতের প্রধান কেন্দ্র যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল, রেডিও পাকিস্তানের প্রধান কেন্দ্রটিও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের করাচীতে। প্রতি দিনের ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা মুল খবরগুলো করাচী থেকে প্রচার হত। রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রসহ অন্যান্য আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো তখন শুধু তা সম্প্রচার করতো। করাচীর প্রধান বাংলা সংবাদ পাঠক ছিলেন সরকার কবীর উদিন। যেহেতু “রেডিও পাকিস্তান” পুরপুরি পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রিত ছিল তাই সংবাদ প্রচার ও অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ছিল । আমারা যা জনতে চাই তার অধিকাংশই সরকারের নিয়ন্ত্রনে প্রকাশ হতনা। আর যা প্রচার করা হত তার অধিকাংশই ছিল অপপ্রচার। যার কারনে “রেডিও পাকিস্তানের” উপর আমাদেরও আস্থা কমতে থাকে।
৩ রা মার্চ ১৯৭১- বুধবার-আওয়ামী লীগের আহবানে আজ লালমনিরহাট সহ সারা দেশে হরতাল পালিত হচ্ছে । এই হরতালে জনগনের অংশ গ্রহন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং শান্তিপূর্ণ। স্থানীয় অবাঙ্গালীরা নিয়ম মাফিক বাজার ঘাটে  দোকান পাট ব্যাবসা বাণিজ্য বন্ধ রাখলেও তারা মিটিং মিছিলে বা সভায় যোগ দিচ্ছে না এবং বিহারি ছাত্ররাও এই সবে যোগদানে বিরত আছে। শহরের আসে পাসের গ্রাম অঞ্চল থেকে প্রচুর লোক জন ও মিছিল করে শহরে আসছে । সবই চলছে স্বতঃস্ফূর্ত এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে । কিন্তু হাংগামা সৃষ্টির সুযোগ নেবার দুস্ট লোকের অভাব  নেই, যারা বাংগালি-বিহারি দাংগা লাগিয়ে জনগনকে ভিন্ন খাতে চালিয়ে তাদের মুল দাবীকে ন্যাশ্যাত করা উদ্দ্যেশ্য। স্থানীয় পুলিশ ও সেই হিসাবে এই সময়ে বাংগালি-বিহারি দাংগা না লাগার জন্য আপ্রান চেষ্টায় করে চলেছে। পুলিশ সদস্যদের উপর গত নির্বাচনের আগ থেকে যে বাড়তি পরিশ্রমের চাপ চলছে তা তাদের শরীর ও  চেহারায় স্পষ্ট।
সারাদিন লালমনিরহাট শান্তিপূর্ণ ছিল। দুপুরে ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্র লীগের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে জনগনকে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রেখে সংগ্রাম চালাতে বলেন। কোন রকম উস্কানিমুলক ফাঁদে পা না দিতে উপদেশ দেন। তাছাড়া দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত আগামীকাল  থেকে সারা দেশে পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ “অসহযোগ আন্দোলন” শুরুর ঘোষণা দেন। রাতের “রেডিও পাকিস্তানের” খবরে প্রথম দুঃসংবাদ এলো যে আজ চট্টগ্রামের রেলওয়ে কারখানা অঞ্চল পাহাড়তলিতে বাংগালি-বিহারি দাংগা হয়েছে ও শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছে । সেখানেও কারফিউ জারী করা হয়ছে । “রেডিও পাকিস্তানের” সেই খবরে  কোন অনুসন্ধান ছাড়াই আওয়ামী লীগ বা বাঙ্গালীদের উপর দোষ চাপাবার চেষ্টা করা হয়ছে যাতে আমাদের সন্দেহ প্রচুর। চট্টগ্রামের পাহাড়তলির এই দুঃখ জনক ঘটনা যে অন্যান্য বিহারী বসতির এলাকায় প্রভাব ফেলবে তা নিশ্চিত।
৪ ঠা মার্চ, ১৯৭১- বৃহস্পতিবার- গতকালের মতই ছাত্র জনতার মিছিল মিটিং চলছে । তবে আজ মিছিলে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মিছিলের মধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন পতাকা দেখা যায় যা লালমনিরহাটে এই প্রথম। সবুজ-লাল-হলুদ এই তিন রংগের পতাকার মাঝে লাল বৃত্তে হলুদ রংগের পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র। তার সাথে মিছিলে নতুন ¯েøাগান যগ হয়েছে - “ছয় দফা না এক দফা - এক দফা ! এক দফা!” । “বীর বাংগালী অস্ত্র ধর - বাংলাদেশকে স্বাধীন করো “। ঐ নতুন পাতাকাটি তবে কি বাংলাদেশের পতাকা? আমরা শুনেছি যে ২ রা মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ছাত্ররা বাংলাদেশের একটি পতাকা উঠিয়েছিল। যার সাদা কালো ছবি (ঢাকায় ৩ রা মার্চ প্রকাশিত) আজ আমরা পত্রিকায় দেখেছি। যেহেতু ১ লা মার্চের শুরু থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (উটঝট) প্রথম থেকেই ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে এবং তারাই দেশব্যাপি সকল ছাত্রনেতাদের সাথে যগাযোগ রাখছে তাই লালমনিরহাটের ছাত্রনেতারা সেই নির্দেশ অনুসরণ করছে। কিন্তুপকিস্তান সরকার বা লালমনিরহাটের সরকারি পুলিশ বাহিনী বিষয়টিকে কিভাবে নেবে? আমার বাবা একজন পুলিশ অফিসার। সমস্ত বিষয়টি আমাদের মধ্যে ভয়-ভীতি ও আনন্দের একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। 
নতুন পরিস্থিতে স্থানীয় পুলিশ কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তবে কি মৌনতাই সম্মতির লক্ষন ?
ব্রিটিশ ভারত বিভাগের আগে সর্ব ভারতীয় নেতা মহাত্মা গান্ধীজীর ব্রিটিশ সরকার বিরোধী “অসহযোগ আন্দোলন” এর কথা আমরা ইতিহাসে পড়েছি ও লোকমুকে শুনেছি। কিন্তু তার বাস্তব রূপ কি তা জানিনা। লালমনিরহাটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে আজ সেই “অসহযোগ আন্দোলন” এর প্রথম দিন। শুধু সরকারি অফিস আদালত ও স্কুল, কলেজ ছাড়া হাট বাজার দোকান পাঠ সবই খোলা। লালমনিরহাট সেকালে একটি মফস্বল থানা শহর। সকারি অফিস বলতে শুধু রেলয়ের কতগুলি অফিস, তহসিল অফিস বা ঐ রকম কিছু। সরকার বিরোধী “অসহযোগ আন্দোলনে” জনগন সরকারকে কোন খাজনা বা অন্যকিছুই দেবেনা বা সহযোগিতা করবেনা। তাই সেগুলো বন্ধ। কিন্তু রেল গাড়ী, চিকিৎসা ও হাস্পাতাল, বেসামরিক খাদ্য সরবরাহ ও জনগণের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা দান চালু বা খোলা থাকবে।
আমরা দেখলাম রাজধানী থেকে বহুদূর মফস্বল থানা শহরে কিভাবে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ “অসহযোগ আন্দোলন” এর প্রথম দিন শেষ হল।
-এই পর্বের সমস্ত ছবি ও সংবাদ ক্লিপ সংগ্রহ করেছেন জনাব ঝধষধয টফফরহ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার, বিভিন্ন যাদুঘর ও আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে তাঁর বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম করে। আমি তাঁর কাছে এ বিষয়ে চীর কৃতজ্ঞ !
আগামী সংখ্যায় ‘উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি’ পর্ব-৫