লালমনিরহাট বার্তা
রংপুরে ইঁদুরের জমানো ধানে ভাগ বসাচ্ছে দরিদ্র মানুষেরা এতেই গরীবের পিঠা-পোলাও
রংপুর অফিস | ২৫ নভেম্বর, ২০২১ ১১:৩৫ AM
রংপুরে ইঁদুরের জমানো ধানে ভাগ বসাচ্ছে দরিদ্র মানুষেরা এতেই গরীবের পিঠা-পোলাও
রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় চলছে আামন ধান কাটা ও মাড়াই। মাঠের পর মাঠ জুড়ে পাকা ধানের সোঁদা গন্ধ ভাসছে। ভোরের কুয়াশা মাখা রোদের পরশ ছড়িয়ে পড়তেই মাঠে কৃষান-কৃষানীরা।নতুন শীতের হিমেল হাওয়ায় নুয়ে পড়া স্বর্ণালি ধানের গোড়ায় কাস্তে চালাতে ব্যস্ত কৃষকেরা। কোথাও দল বেঁধে, আবার কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন ভাবে মাঠ থেকে ধান কেটে ঘরে তোলা হচ্ছে। দিগন্ত জোড়া মাঠ ফাঁকা হবার পর ইঁদুরের গর্তে হানা দিচ্ছে ধান কুড়ানি শিশু ও মানুষেরা।কারও হাতে খুন্তি-কোদাল পাসুন, কারও হাতে ব্যাগ কিংবা ডালি,বস্তা। ফসল সাফ হওয়া খেতে তাদের চোখে খুঁজে ফিরছে ইঁদুরের গর্ত কিংবা পড়ে থাকা ধানের ছড়া। ইঁদুরের জমানো ধানে ভাগ বসাচ্ছে তারা। খেতে পড়ে থাকে ধানের শীষের মালিকানাও তাদের। এ দৃশ্য এখন রংপুর জেলার গ্রামের পর গ্রামজুড়ে। প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে মাঠে চষে বেড়াচ্ছে ধান কুড়ানি ছোট ছেলে মেয়েরা। কোথাও কোথাও বড়রাও ব্যস্ত ধানের ছড়া কুড়ানোয়।
চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় আমনের ফলন ভাল হয়েছে। নতুন ধানে ভালো দামের আশায় চাষীরা। বিস্তীর্ণ ধানের খেত ফাঁকা করে গোলা ভরতে কৃষকেরা এখন পুরোদমে ব্যস্ত। কারো কারো ধান কাটা মাড়াই শেষে বাড়িতে চলছে নতুন ধানের পিঠে, পুলি আর পোলাও খাওয়ার আয়োজন।ব্যতিক্রম শুধু গ্রামে থাকা ভূমিহীন ও গৃহহীন হতদরিদ্র পরিবারের বেলায়। নিজস্ব জমি নেই কিংবা কোনো জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেননি, তারা থাকেন ধান কাটা-মাড়াইয়ের অপেক্ষায়। তাদের কোনো উৎসব নেই। অন্যের জমির ধান কাটা শেষ হলেই তাঁরা খুশি হন। কারণ ফাঁকা জমির পেটে ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে থাকে তাদের আনন্দ। কৃষকরা ধান কাটার সময় ধানের ছড়া খেতে পড়ে থাকে। ওই ধানের ছড়া এলাকার হতদরিদ্র ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের শিশুরা কুড়িয়ে নেয়।
গ্রামাঞ্চলে বেশির ভাগ দিনমজুর ও দরিদ্র পরিবারগুলো কৃষি কাজ করে মজুরি বাবদ ধান অথবা কাজের বিনিময়ে টাকা পায়। যা দিয়ে পছন্দের কেউ কেউ ধান কিনে পিঠা, পুলি, পোলাও করে খায়। কিন্তু কিছু গ্রামের সুবিধা বঞ্চিত হতদরিদ্র পরিবার আছে, যাদের সামান্য মজুরিতে সংসার চলে না। তাদের জন্য পিঠে পোলাও খাবার আশা মানেই ইঁদুরের সংগ্রহ করা খাবারে ভাগ বসানো। পরিবারে সন্তানের পিঠে পোলাও খাবার বায়না পূরণ হয়ে ইঁদুর গর্তে। এই মৌসুমে ধান কুড়ানি শিশুরা দল বেঁধে ছুটে যায় মাঠে। সতর্ক দৃষ্টিতে গর্তে হানা দিয়ে বের করে আনে ধানের শীষ। এসময় তাদের কারো দম ফেলার ফুসরত নেই। সারা গায়ে লেগে লাগা কাদামাটি। কিন্তু এতে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপও নেই।জেলার আট উপজেলার মধ্যে গংগাচড়ার দক্ষিণ কোলকোন্দে কয়েকজন শিশুকে ধান কুড়ানোর সময় কথা হয়।তারা জানায়, পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় ওই শিশুরা মায়ের পরামর্শে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করছে। একই এলাকার ভূমিহীন ভ্যান চালক সুমন মিয়ার ছেলে, কৃষিশ্রমিক মন্তাজের স্ত্রী আমিনা, বিধবা মহিমা, ভিক্ষুক বাদশা মিয়ার স্ত্রী মনি বেগমও ব্যস্ত গর্ত খুঁড়ে ধানের খোঁজে।বিভিন্ন এলাকার ধান কুড়ানিদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, মাঠের ধান কেটে নিয়ে যাবার পর অনেক ধানের ছড়া পড়া থাকে। ইঁদুরের গর্ত খুড়ে তারা ধান বের করে আনে। কেউ আবার পরিত্যক্ত খেতের নাড়ার সঙ্গে থাকা ধান কুড়ায়। এই মৌসুমে ইঁদুরের গর্ত তাদের জন্য আশীর্বাদ।শুধু ইঁদুরের গর্ত থেকে নয়, কৃষক জমি থেকে ধান আনার সময় পড়ে যাওয়া ধানের শীষ কুড়ায়। ইঁদুরের গর্তের ধান ও কুড়ানো ধানের শীষেই এ সকল পরিবারের মাঝে পিঠে পোলাও খাওয়ার আনন্দ দেয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা ধান কাটার সময় ধানের ছড়া খেতে পড়ে থাকে। ওই ধানের ছড়া এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা কুড়িয়ে নেয়। তবে ধানের খোঁজে ইঁদুরের গর্তে হাত দেয়া নিরাপদ নয়। গর্তে সাপসহ বিষাক্ত কিছু থাকতে পারে।
রংপুর অঞ্চল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় ৬ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্যেক বছর আমন মৌসুমে উৎপাদিত ফসলের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ইঁদুরের পেটে চলে যায়। শুধু আমন মৌসুমে মোট উৎপাদনের ছয় শতাংশ ইঁদুরের খাবারে পরিণত হয়।প্রতি মৌসুমে গমের মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ, আলুর ৬ শতাংশ, শাক-সবজির ৫ শতাংশ, নারিকেলের ১০ শতাংশ ও আনারসের ১০ শতাংশ ফলন যায় ইঁদুরের পেটে।
এই বিভাগের আরও খবর