লালমনিরহাট বার্তা
জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা
মোঃ মামুন অর রশিদ | ৬ নভেম্বর, ২০২১ ১১:০৯ AM
জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা
বাংলাদেশের কারাগারের স্লোগান হচ্ছে- ‘‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ।’’এই স্লোগানের সঙ্গে জেল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কয়েদিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হচ্ছে জেল খানা। আর সেই আশ্রয়স্থলে যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তির নির্দেশে কয়েদিদের গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নিয়মরীতি ও মানবতা বলতে কী কিছু থাকে?

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর এমনি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এই জাতীয় চার নেতা কোনো সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ছিলেন না। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করতেন বলে তাঁদের ঠাঁই হয় জেলখানায়।

একটি নির্মম বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি প্রতিপক্ষ ছিল। আর প্রতিপক্ষরা হচ্ছে দেশি ও বিদেশি মিতালী শক্তি। সদ্য স্বাধীন দেশে বিজয়ের আনন্দে বিজয়ীরা যখন আনন্দে উদ্বেলিত, তখন পরাজিত শক্তি পুনরায় সংগঠিত হওয়ার জন্য মরিয়া ছিল। এটাই ইতিহাসের অমোঘ সাক্ষ্য।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে নৃশংসভাবে হত্যা করেই শুধু হত্যাকারীরা ক্ষান্ত হয়নি, হায়েনারা নারী, শিশু হত্যার মত জঘন্য অপরাধও সংঘটিত করেছে। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতার রক্তধারাকে বাংলাদেশ থেকে ঘাতকরা চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যাঁরা লাল-সবুজের পতাকা বহন করতে পারে, তাঁদেরকেও নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। ষড়যন্ত্রকারীরা সাময়িকভাবে সফলও হয়েছিল।

যেভাবে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়

১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ঢাকা শহর ছিল অস্থিরতার নগরী। ঐ সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থান নিয়ে নানা রকম কথা বাতাসে ভাসছিল। ৩রানভেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টা থেকে দুইটার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে একটি পিকআপ এসে থামে। সে সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমিনুর রহমান। রাত দেড়টার দিকে কারা মহাপরিদর্শক টেলিফোন করে জেলার আমিনুর রহমানকে তাৎক্ষণিক ভাবে আসতে বলেন। দ্রুত কারাগারের মূলফটকে গিয়ে আমিনুর রহমান দেখলেন, একটি পিকআপে কয়েকজন সেনা সদস্য সশস্ত্র অবস্থায় আছে। এর কিছুক্ষণ পর তাঁর কার্যালয়ের টেলিফোনটি বেজে ওঠে। আমিনুর রহমান যখন টেলিফোনের রিসিভারটি তুললেন, তখন অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন।

২০১০ সালে বিবিসি বাংলার কাছে সেঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আমিনুর রহমান বলেন, ‘‘টেলিফোনে বলা হলো প্রেসিডেন্ট কথা বলবে আইজি সাহেবের সাথে। তখন আমি দৌড়ে গিয়ে আইজি সাহেব কে খবর দিলাম। কথা শেষে আইজি সাহেব বললেন যে প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোনে বলছে আর্মি অফিসাররা যা চায়, সেটা তোমরা কর।’’

রাত প্রায় ৩টা পর্যন্ত কারাগারের মূল ফটকের সামনে কথাবার্তা চলতে থাকে। এক পর্যায়ে কারাগারে থাকা তৎকালীন আওয়ামী লীগের চার নেতাকে একত্রিত করার নির্দেশ আসে। এরপর কারা মহাপরিদর্শক জেলার আমিনুর রহমানের হাতে চার জনের নাম লেখা একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এদেরকে এক জায়গায় করো। সেই চারজন হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান। এই চার নেতাকে দ্রুত একত্রিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

জেল হত্যাকাণ্ডের সময় জাতীয় চার নেতার সাথে কারাগারে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। জেল হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি বিল্ডিংয়ের ১ নম্বর কক্ষে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ সহ ৮ জন। ২ নম্বর কক্ষে ছিলেন এএইচএম কামারুজ্জামান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সহ ৮/৯ জন। ৩ নম্বর কক্ষে ছিলেন এম মনসুর আলী, আব্দুস সামাদ আজাদ, আমির হোসেন আমু সহ প্রায় ১২ জন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদকে তাঁদের কক্ষে রেখে বাকি কয়েদিদের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। অন্য দুটি কক্ষ থেকে এএইচএম কামারুজ্জামান এবং এম মনসুর আলীকে ১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। তারপর জাতীয় চার নেতাকে একসাথে ব্রাশ ফায়ার করা হয়। ব্রাশ ফায়ার করার পর ঘাতকরা চলে যায়। তিনজন নেতা তাৎক্ষণিক ভাবে মৃত্যুবরণ করলেও একজন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। এ খবর পেয়ে ঘাতকরা জেল গেট থেকে এসে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জাতীয় চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এভাবে নৃশংসভাবে জাতীয় চার বীর সন্তানকে হত্যা করা হয়।

জাতীয় চার নেতার জেলে থাকাকালীন কয়েকটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। জাতীয় চার নেতা আলাপচারিতায় অন্যান্য নেতাদের বলতেন, ‘‘বেশি দিন হয়ত আমাদের জেল খানায় থাকতে হবেনা।’’ একদিন জেল খানায় এম মনসুর আলী অন্যান্য নেতাদের উদ্দেশ্য করে উচ্চ স্বরে বললেন, ‘‘যদি তোমরা জেল থেকে বের হয়ে যাও, তাহলে বেইমানি করবে না তো? প্রতিশোধ নিতে পারবি?’’ উপস্থিত নেতারা বলেন ইনশাআল্লাহ। প্রতিশোধ নেওয়ার সেই সুযোগ আর পাননি এম মনসুর আলী।

জেল খানায় তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বপ্ন দেখে ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ স্বপ্নের বর্ণনা দেন এভাবে- ‘‘বঙ্গবন্ধু আমাকে একটি কালো গাড়িতে তুলে বলেন, টুঙ্গিপাড়ায় যেতে হবে। আমি বুঝেছি, আমার সময় বেশি নাই আর। আমাকে যখন ডাক দিয়েছে, নিয়েই যাবে।’’ ৭/৮ দিন পর ঠিক একই ধরনের একটি স্বপ্ন দেখেন এম মনসুর আলী। এই দুটি স্বপ্ন থেকে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁদের আর বেশি দিন সময় নেই। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর তাঁদের সময় শেষ হয়ে যায়।

জাতীয় চার নেতাকে হত্যার কারণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের মধ্যে নেতৃত্ব সংকট সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধুর পর এইচার জাতীয় নেতা ছিলেন দলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ আগস্টের পর চার জাতীয় নেতাসহ জ্যেষ্ঠ অনেক নেতা ছিলেন কারাগারে এবং কেউ কেউ ছিলেন আত্মগোপনে। বাকি আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্যে খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে সমঝোতা করেন। অনেক নেতা আবার রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

জেল হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হলো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার করে ক্ষমতা দখল করার পরেও ঘাতকরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর থেকেই হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা পাল্টা আরেকটি অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় ছিলেন। সে সময় সেনাবাহিনীর মধ্যেছিল একধরনের বিশৃঙ্খলা। জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন যে কোনো পাল্টা অভ্যুত্থান হলে সেটি আওয়ামী লীগের সমর্থন পাবে এবং জেলে থাকা চার জাতীয় নেতা নেতৃত্বে চলে আসবে। তারা আরো বুঝতে পেরেছিল যে এই চার নেতা জীবিত থাকলে তারা কোনোদিন রেহাই পাবে না। এঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে অটুট থাকবেন। এরকম আশঙ্কা থেকে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। জেল হত্যাকাণ্ডের সাথে ৩রা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কিত।

জেল হত্যা মামলার রায়

দুঃখজনক হলেও সত্য, জেল হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার তিনটি ধাপ পার হলেও দণ্ডিত ১১ আসামির ১০জন এখনো পলাতক। জেল হত্যাকাণ্ডের পরদিন তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় মামলা করেন। দীর্ঘ ২১ বছর হত্যাকাণ্ডের তদন্তও বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখাহয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে জেল হত্যা মামলা পুনরুজ্জীবিত করে।

১৯৯৮ সালে ২০ জনকে আসামি করে সিআইডি আদালতে চার্জশিট দেয়। জেল হত্যার ২৯বছর পর ২০০৪ সালের ২০অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার রায়ে ৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। রায়ে ৪ জন রাজনীতিক ও একজন সরকারি কর্মকর্তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট এক রায়ে শুধু রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধা এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত অপর চার আসামিকে খালাস দেন। হাইকোর্টে খালাস প্রাপ্ত এ চার জনের ফাঁসি কার্যকর হয় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায়। আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ফাঁসির দণ্ড প্রাপ্ত তিন আসামির মধ্যে শুধু দু’জনকে খালাস দেওয়ায় রায়ের ওই অংশটির বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১৩ সালে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ জেল হত্যা মামলার চূড়ান্তরায়দেন। হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। জেল হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের দণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা জাতি।

নতুন প্রজন্মের নিকটজাতীয় চার নেতার অবদান তুলে ধরার অংশ হিসেবে তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো:

সৈয়দ নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি ১৯২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা) সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের বীরদাম পাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৭ সালে ইতিহাস বিষয়ে এমএ এবং ১৯৫৩ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৪৯ সালে সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৫১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি ময়মনসিংহে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনকালে গঠিত সর্বদলীয় একশন কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৫৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ছয়দফা আন্দোলনের কারণে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলে তিনি আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে ১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত দুই দফা বৈঠকে তিনি আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৭ আসন থেকে জয়লাভ করেন এবং আওয়ামীলীগের সংসদীয় দলের উপনেতা নির্বাচিত হন।

তিনি মুজিব নগর সরকারের উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রীসভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-২৮ আসন থেকে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন৷নির্বাচন পরবর্তী মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ৷এছাড়া তিনি জাতীয় সংসদে উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর জেলার অন্তর্গত কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি.এ. (সম্মান) এবং আইনে ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত ঢাকা জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগের (১৯৫৫ সালে‘ আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নাম পরিবর্তন করে ‘আওয়ামী লীগ’ রাখা হয়) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪-এর নির্বাচনে তিনি যুক্ত ফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে যে সর্বদলীয় নেতৃ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, সেই সম্মেলনে শেখ মুজিবের সাথে তিনিও যোগদান করেন। সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে তাজ উদ্দীন ছিলেন অন্যতম সদস্য। ঐ বছরের ৮ মে তিনি দেশ রক্ষা আইনে গ্রেফতার হন। ১৯৬৮ সালে জেলে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে পুনঃনির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি ভারতে যান এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। ভারত যেদিন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সেদিন সাংবাদিকগণ তাজউদ্দীন আহমদের অনুভূতি জানতে চেয়েছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ সেদিন বলেছিলেন, আমি দাই এর ভূমিকা পালন করেছি। এখনো পিতাকে তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া খবর দেওয়া হয়নি (বঙ্গবন্ধুকে তিনি এ খবর দিতে পারেননি)। এ কথা বলার সময় তাজউদ্দীন আহমদ আবেগ আপ্লুত হয়েছিলেন এবং তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রীসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাজউদ্দীন আহমদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এম মনসুর আলী

এম মনসুর আলী সিরাজগঞ্জ জেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়িপাড়ায় ১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও আইনে ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ নেন এবং পিএলজি- এর ক্যাপ্টেন পদে অধিষ্ঠিত হন। ঐ সময় থেকেই তিনি ক্যাপ্টেন মনসুর নামে পরিচিত হতে থাকেন। পাকিস্তানি শাসনে বিক্ষুব্ধ মনসুর আলী সেনাবাহিনী থেকে সরে এসে ১৯৫১ তে পাবনা জেলা আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। সে বছরই তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি মুজিব নগর সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে মনসুর আলী পুনরায় পাবনা-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবছর তিনি আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি দলের সদস্য নির্বাচি তহন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে সকল দলকে একত্রিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করেন। এসময় ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধু মন্ত্রি সভার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এম মনসুর আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান

আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯২৬ সালের ২৬ জুন রাজশাহী জেলার তৎকালীন নাটোর মহকুমার বাগাতিপাড়ার মালঞ্চী রেল স্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্মাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৭ তিনি সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি রাজশাহী থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি মুজিব নগর সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কামারুজ্জামান ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে গঠিত মন্ত্রি সভায় তিনি শিল্প মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এএইচএম কামারুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

জাতীয় চার নেতাকে মূল্যায়ন

জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ছিলেন। ১৯৭৫ সালের১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক এই চার নেতাকে মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন। জাতীয় চার নেতার হাতে দুটি বিকল্প ছিল- একটি হচ্ছে মন্ত্রীসভায় যোগ দেওয়া, অপরটি হচ্ছে জেলে যাওয়া। জাতীয় চারনেতা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ না দিয়ে জেলে গিয়েছেন। ক’জন বাঙালি এরকম দূরদর্শী সিন্ধান্ত নিতে পারে? জাতীয় চার নেতা নির্মোহ ছিলেন বিধায় এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। তাঁরা জীবনের চেয়েও দেশকে বেশি ভালবাসতেন। তাই তো তাঁরা মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই জাতীয় চার নেতা বাঙালি জাতির ইতহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র।

বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর মতো নেতৃত্বকে সমূলে উৎখাত করার একটি নৃশংস পদক্ষেপ হচ্ছে ৩রা নভেম্বরের নারকীয় জেল হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ১৫ আগস্টের অসমাপ্ত হত্যাকাণ্ডের বাস্তবায়ন। ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যা, ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা, ৩রা নভেম্বরের জেল হত্যা এবং ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলাএকই সূত্রে গাঁথা। এরকম হত্যাকাণ্ড জাতি আর দেখতে চায় না। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে জাতি ততদিন বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
লেখক: মোঃ মামুন অর রশিদ, জেলা তথ্য অফিসার, লালমনিরহাট
ইমেইল:[email protected]
এই বিভাগের আরও খবর