লালমনিরহাট বার্তা
মোটরসাইকেল কেনো মরণযান
বার্তা ডেস্ক : May 27, 2021, 7:11:29 PM সময়ে

মোটরসাইকেল কেনো মরণযান

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেলে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। মোট দুর্ঘটনার ৪৫ শতাংশই ঘটেছে বাইকে। এসব দুর্ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাইক আরোহীরা হয় গুরুতর আহত হয়েছেন অথবা প্রাণ হারিয়েছেন।

বাইক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ রাইডার, মোটরসাইকেল বিপণন কর্মকর্তা ও চালকদের সঙ্গে ইত্তেফাক অনলাইন থেকে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় চালকদের অদক্ষতাই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

তবে অদক্ষতার পাশাপাশি মহাসড়কে বাইকের সংখ্যা বৃদ্ধি, রাস্তায় অন্যান্য ভারী গাড়ির আধিপত্য, আলাদা লেন না থাকা, মহাসড়কে সিএনজি-রিকশা-ভ্যান চলাচল, বাজার থাকা, পথচারীদের রাস্তা পারাপারে অসচেতনা ইত্যাদি বাইক দুর্ঘটনার অন্যতম অনুঘটক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে গাড়ি চালানো শেখার অনেক ট্রেনিং সেন্টার থাকলেও বাইক চালানো শেখার মতো তেমন প্রতিষ্ঠান নেই। পরিচিত মানুষের বাইক ধার করে বা সরাসরি নতুন/পুরনো বাইক কিনে অনেকেই চালানো শেখে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না শেখার ফলে ড্রাইভিংয়ের সঠিক প্রক্রিয়া অনেকেই জানেন না। এতে করে বাড়ছে দুর্ঘটনা।

কেউ কেউ বলেছেন, আগের তুলনায় বাইকের সংখ্যা এবং বাইকে লম্বা ভ্রমণের প্রবণতা বেড়েছে। বাইকের সংখ্যা বৃদ্ধির সমর্থনে তথ্য মিলেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকেও। গত পাঁচ বছরে নতুন মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে দুই লাখ ২৯ হাজার ১০টি বাইকের নিবন্ধন করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দ্বিগুণ। সেবছর নিবন্ধিত হয় চার লাখ এক হাজার ৪৫২টি বাইক।
এছাড়া ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫১৪টি। পরবর্তী ১০ বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। এখন দেশে মোট নিবন্ধিত বাইকের সংখ্যা ৩১ লাখ ৯২ হাজার ৫১১টি।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশে বাইকে লম্বা দূরত্ব ভ্রমণ বেশ চ্যালেঞ্জিং। অনেক রাইডারই এই চ্যালেঞ্জ নিতে পারছেন না। দেখা যায় ভ্রমণের এক পর্যায়ে গিয়ে সাইড ভিউ মিররে খেয়াল রাখার মতো মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন অনেকে। রাস্তায় যত্রতত্র পথচারী পারাপার ও সিএনজি-রিকশা-ভ্যান চলাচলের কারণে অনেক সময় প্যানিক ব্রেক করতে বাধ্য হন রাইডাররা। এ সময় ব্রেকিংয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।


মহাসড়কে ভারি যানবাহনের আধিপত্যের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে আলোচনায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায়ই বাস-ট্রাকের চালকরা বাইকচালকদের সাইড দিতে চায় না। ফলে বেশিরভাগ সময় রাস্তার ধারে বাইক নামাতে বাধ্য হন রাইডাররা। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভারতে অবস্থিত বিশ্বের উচ্চতম মোটরেবল রোড খারদুংলা পাস সামিট করেছেন আবদুল মোমেন রোহিত। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এ অর্জন করেন। রোহিত ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, মহাসড়কে বাইক চলাচল আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। এ কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেড়েছে। আর দেশের হাইওয়েতে তো বড় গাড়ির মাসল পাওয়ার চলে। তারা অমানবিকভাবে চাপ দিয়ে বাইকারদের রাস্তা থেকে নেমে যেতে বাধ্য করে। উত্তরবঙ্গের রাস্তাগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি।

তিনি ইত্তেফাক অনলাইনকে আরও বলেন, মহাসড়কে বাজার, তিন চাকার যান চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরপর আছে বাইকারদের অদক্ষতার বিষয়টি। রাস্তায় বাইকের জন্য আলাদা লেন করা গেলে দুর্ঘটনা অনেক কমবে। ব্যাপারটা এমন হতে পারে-বাস-ট্রাক চলবে একপাশের লেনে, অন্য লেনে চলবে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল।

দেশের প্রথম মোটরসাইকেল ব্লগ বাইকবিডির প্রতিষ্ঠাতা শুভ্র সেন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, বাংলাদেশে বাইক চালানো শেখার তেমন কোনো ট্রেনিং ইন্সটিটিউট নেই। সরকারিভাবে এমন কোনো উদ্যোগও খুব কম। ফলে পর্যাপ্ত দক্ষতা ছাড়াই মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামছে বেশিরভাগ মানুষ।

তিনি জানান, বাইরের দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিভিন্ন ক্যাটাগরি থাকে। সেখানে প্রথমেই কেউ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বাইক চালাতে পারে না। আমাদের দেশেও এমন সিস্টেম করা যেতে পারে। হয়তো প্রথম ধাপ হতে পারে ১০০ সিসি বা ১২৫ সিসি বাইক চালানোর লাইসেন্স। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চালানোর পর দ্বিতীয় ধাপে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত চালানোর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

তবে এ ধারণায় দ্বিমত পোষণ করেছেন রোহিত। তিনি ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, বাইরের দেশের মতো আমাদের দেশেও এই সিস্টেম করা যেতো যদি এখানে কোনো সিসি লিমিট না থাকতো। বাইরের দেশে লাইসেন্সের প্রথম ধাপেই ২৫০ সিসি বাইক চালানোর অনুমতি পাওয়া যায়। ওসব জায়গায় বাইকাররা পর্যায়ক্রমে হাজার সিসির বাইকও চালাতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে ১৬৫ সিসি পর্যন্তই লিমিট। ১২৫ থেকে ১৬৫ সিসির শক্তির পার্থক্য এতো না যে আলাদা ক্যাটাগরি প্রয়োজন।

বারিধারার হোন্ডা লাইফের বিপণন কর্মকর্তা আনাস আনসারী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, বর্তমানে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় একজন সত্যিই রাস্তায় বাইক চালানোর উপযুক্ত কীনা তা বোঝার কোনো উপায় নেই। লাইসেন্স পরীক্ষার ফিল্ড টেস্ট ধাপে শুধু সামান্য জিগজ্যাগ টেস্ট হয়। যেকেউ আধাঘণ্টা প্র্যাকটিস করলেই এই ধাপ পেরোতে পারে। লাইসেন্স পরীক্ষায় আধুনিকায়ন দরকার আছে।

তার মতে, লম্বা ভ্রমণে অনেক রাইডারই মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। অনেকে তো লুকিং গ্লাস দেখার কথাই ভুলে যান। সেফটি গিয়ারের ব্যবহারও কম। প্যানিক ব্রেকিং বা হার্ড ব্রেকিংয়ের কারণে অনেকেই বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ব্রেকের সমন্বয় করা জরুরি। আবার খালি রাস্তা পেয়ে ‘উরাধুরা’গতিতে চালানোর প্রবণতাও আছে। এতে কে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে সেদিকে ভালো করে নজর দেওয়া যায় না।

বাইকারদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের প্রশিক্ষণ দিতে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়মিত নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে বলেও জানান আনাস আনসারী।

বাইকপ্রেমী ও ব্যবসায়ী রেজওয়ানুল ইসলাম মনে করেন, বাইক দুর্ঘটনার মূলে আছে প্রশস্ত রাস্তার অভাব। পাশাপাশি মহাসড়কে বেপরোয়া রাইডিং অনেক বেড়ে গেছে। ওভারটেকিং প্রতিযোগিতার কারণেও বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।