লালমনিরহাট বার্তা
তিস্তায় ও ধরলার পানি বৃদ্ধি : খাবার সংকটে পানিবন্দি মানুষ
শহিদ ইসলাম সুজন | ১৭ জুন, ২০২২ ৪:২৫ PM
তিস্তায় ও ধরলার পানি বৃদ্ধি : খাবার সংকটে পানিবন্দি মানুষ
উজানের ঢল ও টানা অব্যাহত ভারী বর্ষণে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি টইটম্বুর । আষাঢ়ের শুরুতেই হু হু করে বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। বিপৎসীমা ছাপিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে। তিস্তা ও ধরলা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা কাটাচ্ছে নির্ঘুম রাত। পানি প্রবাহ বেড়ে তলিয়ে গেছে বাদাম, মরিচ, পেঁয়াজ, মিষ্টি কুমড়া ও ভুট্টাসহ বিস্তীর্ণ বিভিন্ন উঠতি ফসল। জেলার ৪ উপজেলার প্রা ১৬ হাজার মানুষ হাঁটু বা কোমর পানিতে বন্দী দশায় আছেন। এসব মানুষের হাতে এখনো পৌঁছেনি কোনো সহায়তা।লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে ৪৪টি স্লুইসগেট খুলে রাখা হয়েছে। পানি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় তিস্তার চর এলাকাগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছে। টানা বৃষ্টিপাতে তিস্তা ছাড়াও ধরলা, রতনাই নদীসহ জেলার অন্যান্য নদ-নদী ও খাল-বিলে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ক্রমেই বাড়ছে দুর্ভোগ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, শুক্রবার (১৭ জুন) ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। আর ধরলা নদীর বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পারি প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তিস্তা, ধরলা ও রতনাই নদীতে হু হু করে পানি বাড়তে থাকায় চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাদামসহ বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হাজারো বাড়িঘরে ঢুকে পড়েছে পানি। অনেক জায়গায় এখনো হাঁটু ও কোমর সমান পানি। এদিকে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়ায় ভাঙন ঠেকাতে এসব স্থানে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোড।
প্লাবিত এসব এলাকার, বাঁশের সাঁকোসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিবর্ণ তিস্তাপাড়ের মানুষদের চোখে কয়েকদিন থেকে ঘুম নেই। ভাঙন এলাকার বাসিন্দারা বলেন কখন কী হয় সে চিন্তাই এখন মনে ভর করেছে আমাদের। আমাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিজতলা ও ফসলি খেত পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বন্দিরা জানায়, কয়দিন থাকি নদীত পানি বাড়তে আছে। তাতে ফির আইত (রাত) হইলে বৃষ্টি। হামরা বউ-ছাওয়া নিয়্যা খুব কষ্টোত আছি। কয়দিন থাকি ঠিক মতো ঘুম হওচে না। ভয় নাগে, কখন কী হয়। অ্যালাও তো হামরা হাঁটু পানিত আছি। কোন্টে কোনা রান্দিবারি খামো, সেই জায়গাও নাই। বন্যা এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। এখনো তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি। কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি থাকা এসব মানুষ চুলোয় আগুন জ্বালাতে পারছে না। তাদের অনেকেরই দু’বেলা খাবার মতো ব্যবস্থাও ফুরিয়েছে। এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যান-মেম্বার কারও কাছ থেকে কোনো খাদ্য সহায়তাও মেলেনি।
তিস্তা পাড়ের কৃষক মাসুম মিয়া বলেন, নদীপাড়োত জন্ম নেওয়াটাও হামার অপরাধ। সরকার চাইরোপাকে (সবখানে) উন্নয়ন করে, খালি হামার তিস্তা নদীর কিছু করে না। কত দিন ধরি শুনোছি ভারতের সাথে তিস্তা চুক্তি হইবে। কিন্তু কামের কাম কিছুই হয় নাই। অ্যালা (এখন) ফির চীনের সাথে নাকি সরকার নদী শাসন (তিস্তা মহাপরিকল্পনা) করবে। বছরে বছরে কত কথা শুনি, হামার এত্তি কোনো কাম চোখোত পড়ে না বাহে।

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তির ব্যর্থতা ও সরকার ঘোষিত তিস্তা নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ এ অঞ্চলে প্রতিবছর ক্ষয়ক্ষতি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে গত বছরের বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বর্ষা মৌসুমের আগেই তিস্তা নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। এখন তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলি খেতসহ অনেকের বসতভিটা তিস্তার পেটে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এবারের বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি তিস্তার বালুর চরে চাপা পড়ে নষ্ট হয়েছে। নদীপাড়ের মানুষেরা এখন ঘরহারা, ভিটাহারা, উদ্বাস্তু। জরুরিভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ভুর্তকি কিংবা পুনর্বাসনের উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। না হলে কৃষিনির্ভর তিস্তা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে মহাবিপর্যয় দেখা দেবে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানিয়েছে, উজানের ঢল আর অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা, ধরলা, রতনাইসহ এ অঞ্চলের নদ-নদীতে পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রংপুরে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, ভাঙনকবলিত কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনিয়া চর ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি গ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ক্ষতির মুখে। তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। টেকসই-মজবুত বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সমীক্ষা করা হচ্ছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লালমনিরহাট ত্রান ও পূর্নবাসন দপ্তর জানান, আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। জেলার ৪ উপজেলা ১৫ হাজার ৫০ পানিবন্দি পরিবারের জন্য প্রতিটি পরিবার ১০ কেজি করে জিআর চাল বরাদ্দ রয়েছে। মোট ১শত ৫০দশমিক ৫শ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ রয়েছে। শিশু খাদ্যের জন্য ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। এবং গো খাদ্যের জন্য ৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। যা আগামিকাল থেকে বিতরণ শুরু হবে।
এই বিভাগের আরও খবর