লালমনিরহাট বার্তা
অদম্য উদ্যোক্তা মুক্তা, একজন বিউটিশিয়ান
সূফী মোহাম্মদ: : May 2, 2021, 12:45:54 PM সময়ে

অদম্য উদ্যোক্তা মুক্তা, একজন বিউটিশিয়ান

আজকের উদ্যোক্তা

মোছা: আকলিমা আকতার মুক্তা। পৈতৃক নিবাস ঢাকা বিক্রমপুর হলেও তার জন্ম লালমনিরহাট পৌরসভার কালিবাড়ীতে। পিত মো: আবুল কাসেম (মৃত) ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। লালমনিরহাট রেল বাজারে মি: কাসেমের ‘বাসন বিতান’ নামে একটি ক্রোকারিজের দোকান ছিল। পিতা মৃতুর পর মুক্তার মা বিক্রমপুর চলে যান। কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়া অবস্থায় বিভিন্ন কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালে যখন তিনি লালমনিরহাট সরকারি কলেজে ডিগ্রীতে পড়ছিলেন, তখন মুক্তার পিতামাতা পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপন খালাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ দেন। বিবাহের কিছুদিন ভালই চলতে থাকে। মুক্তার কোল জুড়ে আসে একটি ফুটফুটে মেয়ে। স্বামীর শহরেই একটি ঔষদের ফার্মেসী ছিল, কিন্তু একসময় এসে ব্যবসাটি ক্ষতিগ্রস্থ হলে মুক্তার স্বামীর পক্ষে পরিবার চালানো অনেক কষ্টের হয়ে পরে। পিতার সহযোগিতা নিয়ে মুক্তা তার স্বামীকে এবার আর একটা ব্যবসা ধরিয়ে দেন, কিন্তু হায়! সেটাও টেকানো গেলোনা। মুক্তা যেহেতু পড়াশোনা জানা মানুষ তাই স্বামীকে ও সংসারে সহযোগিতা করতে চাকরির সিদ্ধান্ত নেন। বাঁধ সাথে পরিবারের সবাই। তার আর চাকুরি করা হয়ে ওঠেনা। মুক্তা ছোটবেলা থেকে পরিপাটি করে নিজেকে সাজিয়ে নিতেন এবং অন্যকে সাজানোর প্রতিও একটা প্রবল ঝোক ছিল। সংসারের এই চরম সময়ে এবং চাকুরি করতে না পারার কষ্টকে এবার ভিন্নভাবে সাজাতে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি স্বাধীন ব্যবসা করবেন, যেখানে অন্যকে চাকুরি দিতে পারবেন। মুক্তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, অন্যকে সাজোনোর মাধ্যমেই হয়ে উঠবেন একজন উদ্যোক্তা, এ শহরে মুক্তা হবেন একজন বিউটিশিয়ান। বাণিজ্যিকভাবে একজন বিউটিশিয়ান হতে গেলে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ। এবার মুক্তা তার শিশু কন্যাকে সাথে নিয়ে ঢাকায় চলে গেলেন। সাল ২০০৪। বোনের বাসায় বাচ্চাকে রেখে তিনি প্রতিদিন যাত্রাবাড়ীর অনামিকা বিউটি পার্লারে আসতে শুরু করলেন। সেখান থেকে তিনি ৮ মাসের একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে লালমনিরহাটে ফিরে আসেন। এসময় প্রায় বছরখানে তিনি বাসার আশেপাশের মেয়েদের ফ্রি কিংবা নামমাত্র সম্মানী নিয়ে সাজাতেন যাতে প্রকটিসটা অব্যহত থাকে। রেলবাজার মডার্ণ লাইব্রেরীর অপর পাশে মুক্তার একটি নিজস্ব দোকান ঘর ছিল যা তার নানা তাকে লিখে দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালের দিকের কথা, স্বামী রিপনকে জানালেন যেন দোকানটি ডেকোরেশন করেন। মুক্তার কিছু জমানো অর্থ ছিলো, সে অর্থ দিয়েই শুরু হলো বিউটি পার্লারের যাত্রা। বধুয়া বিউটি পর্লার, এটাই সম্ভবত লালমনিরহাট শহরে প্রথম পার্লার। অল্প সময়ের মধ্যে যেমন বধুয়া বিউটি পার্লার জমে উঠতে শুরু করলো, সাথে সাথে শহরে গুঞ্জন, নানা রটনা চলতে থাকে। একজন নারী হয়ে শহরের প্রাণ কেন্দ্রে মেয়েদের সাজগোজ করার ব্যবসাটাকে অনেকে মেনে নিতে পারেনি। বধূয়া বিউটি পার্লারের জন্য মুক্তা একটি বিজ্ঞাপন ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে (ডিস) প্রচার করেছিলেন, যেখানে তার নিজস্ব মোবাইল নাম্বারটি দেয়া ছিলো। এই নাম্বার প্রচার হওয়ার সাথে সাথে সকাল-সন্ধ্যা-রাতে বিভিন্ন নাম্বার থেকে কল আসতে শুরু করে। এ কলগুলোর ৯০ ভাগই মুক্তার জন্য সুখকর ছিলোনা। নীচু মনের কিছু ছেলেরা বিভিন্ন প্রশ্ন এবং অফার করতে থাকে, ফলে মুক্তাকে পদে পদে হতে হয়েছে লাঞ্ছিত; কটু কথার তিব্র তীর মুক্তাকে দমাতে পারেনি। প্রচন্ড সাহস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে আকলিমা আকতার মুক্তা এগিয়ে চলেন সামনের দিকে। কোল জুড়ে আবার আসে আর একটি সন্তান, এবার রাজকুমার, সাল ২০০৯। অত্যান্ত নিষ্ঠা আর কাজের প্রতি একাগ্রতা মুক্তাকে এগিয়ে নিলেও বিধাতা কেন যেন বিমুখ হলেন। সংসার জীবন শুরুর প্রথম থেকেই মুক্তা মুক্ত ছিলেন না। নানান প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিজের ব্যবসার মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রেখেও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। ২০১৬ সাল মুক্তার সাথে বেইমানী করলো। সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে বেড়িয়ে আসলেন স্বামীর ঘর থেকে। শুরু হয় মুক্তার সংগ্রামী দ্বিতীয় জীবন। তার মা ঢাকা থেকে ফিরে আসেন লালমনিরহাটে। তিনি এবার দাঁড়ালেন মেয়ের পাশে। মায়ের কাছ থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্রাক থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন নিয়ে সাপটানা বাজারে একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে আবার বধুয়া বিউটি পার্লারের যাত্রা করেন ২০১৮ সালে এসে। নতুন উদ্যোম, নতুন আশায় নতুন সংসার। স্বামী, শ্বাশুড়ীর প্রচন্ড সহযোগিতা মুক্তাকে আবার বাঁচতে শেখায়। স্বামী, শ্বাশুড়ী, মায়ের ভালবাসা আর নিজের কঠোর শ্রমে আবার এগিয়ে চলেন তিনি। যুক্ত হন ব্রাকের প্রশিক্ষক হিসাবে, এসএমই ফোরামের সহ সমন্বয়ক হিসাবে নিজের যোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠা করেন। জড়িয়ে যান রাজনীতির সাথে। আওয়ামী যুব লীগের লালমনিরহাট পৌরসেক্রটারী হিসাবে যুব নারীদের নানামুখী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠানের আনুসাঙ্গীক খরচ, কর্মচারীর বেতন, দোকান ভাড়া, বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, প্রত্যাহিক সংসার খরচ ইত্যাদি নানান খরচের একমাত্র উৎস হয়ে ওঠে বধুয়া বিউটি পার্লার। মুক্তার জীবনে যেন আবার ছন্দপতন। বিভিন্ন বন্ধ এবং লকডাউন মুক্তাকে আবার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। মুক্তার ভাষার- “ করোনা এসে আমরা মাসে যেটা ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ইনকাম করতাম, এখন আমাদের ১০ হাজার টাকাও হয়না। আবার লকডাউন, কয়দিন পর পর বন্ধ কীভাবে আমাদের সংসার চলে! স্বামী এখন অনেকটাই বেকার। সন্তানসম্ভবা আমি তাই আর বাচ্চা ৩টা নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। বাসা ভাড়া দিতে হয়, দোকান ভাড়া দিতে হয়, কর্মচারীর বিল, কারেন্ট বিল, খাওয়া-দাওয়ার খরচ, মায়ের ঔষধ, এখন অনেক কষ্ট! পরিচিতজন, মেম্বর-চেয়ারম্যান, বন্ধ-বান্ধবদের কাছে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। পেটে ক্ষুধা রেখে মুখে লজ্জা নিয়ে আর থাকতে পাচ্ছিনা। তাই এখন চেয়ে খাওয়া ছাড়া উপায় নাই!” পার্লারের পাশাপাশি আকলিমা আকতার মুক্তার দর্জি কাজের প্রশিক্ষণ রয়েছে। একাজে তিনি প্রশিক্ষক হিসাবে অনেকমেয়েকে প্রতিক্ষণ প্রদান করেছেন। এছাড়া রঙ্গের কাজ যেমন- টাইডাই, বøক, বিভিন্ন রকমের শো-পিস বানানোর প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন। ১০ েেক ১৫ জনের এক একটি দল গঠন করে এসব বিষয়ে তিনি কোর্স করিয়ে থাকেন। এভাবেও তিনি একটি বিকল্প আয়ের পথ করে রেখেছেন। কিন্তু বর্তমানে করোনার কারণে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পাচ্ছেননা মুক্তা। এসএমইফোরামের অনলাইন সপে ৫ ধরণের আচার নিজেই তৈরি করে পাঠান এবং সেখান থেকেও একটি আয় আসে, এছাড়া কেউ অর্ডার দিলে তিনি তা সরবরাহ করে থাকেন। শুধু পার্লার দিয়ে যখন হিমসিম অবস্থা, তখন আর কি কি তিনি পারেন তার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মুক্তা তার পার্লারে সাথেই রেডিমেট পোষাক ও শো-পিসের একটি ছোট্ট দোকান শুরু করেছেন। রেডিমেট পোষাকের পাশাপাশি কাপড় দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শো-পিস, জিআই তার দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শো-পিস, পাটের কার্পেট ইত্যাদি এদোকানে বিক্রি করছেন কিন্তু করোনার কারণে তাও মুখথুবরে পরে আছে। চলতি বছরের জানুযারি মাসে মুক্তা বিসিক থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন পেয়েছেন যা দুই বছরে পরিশোধ করতে হবে। প্রতি মাসে ২৫শ টাকা করে তিনি পরিশোধ করছেন। লালমনিরহাট বিসিক থেকে এই লোনটি পেতে মুক্তাকে কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। এছাড়া বিসিক থেকে আরো কিছু প্রশিক্ষণের জন্য তালিকায় অর্ন্তভূক্ত রয়েছেন। তবে ব্যাংক থেকে লোন প্রাপ্তির বিষয়টি মুক্তার জন্য হয়েছে অনেক কষ্টের কারণ। মুক্তা জানায়, উদ্যোক্তা নারীদের জন্য সহজ কিস্তিতে একটা লোন পাওয়ার কথা সরকার বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করেছে কিন্তু ব্যাংক এতো যে জটিলতা তৈরি করে রেখেছে, তাতে সে লোন যেন সোনার হরিণ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এ লোন থেকে বঞ্চিত করে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িদেরকে প্রদান করছেন। প্রকৃত উদ্যোক্তারা পাচ্ছেননা, গরিব উদ্যোক্তারা পাচ্ছেননা। গত একটি বছরে করোনার কারণে ব্যবসায় যে মন্দা চলছে তাতে বেঁচে থাকাই দায় হয়েছে, সেখানে ব্যাংকের এত শর্ত পূরণ অসম্ভব। যদি ব্যাংকগুলো সহজ ও সরল ভাবনায় সহযোগিতা করতো তাহলে এই দূর্দিনে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে একটু ভালোভাবে সংসার চালানো যেত বলে মুক্তা মনে করেন। যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন নারী এবং নারীদের জন্য তিনি এতো উন্নয়নের কথা ভেবেছেন, তাই তিনি যদি ব্যাংকগুলোকে বলে খুব সহজ উপায়ে, সহজ কিস্তিতে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের লোন পেতে সহযোগিতা করবেন করোনাকালীন মুক্তার এটা চাওয়া .