লালমনিরহাট বার্তা
“শিক্ষার রপান্তরে শিক্ষকই অগ্রদূত”
খুরশীদুজ্জামান আহমেদ | ৫ অক্টোবর, ২০২২ ৭:০১ AM
“শিক্ষার রপান্তরে শিক্ষকই অগ্রদূত”

আজ ৫ অক্টোবর ২০২২ খ্রিঃ , বিশ্ব শিক্ষক দিবস । বাংলাদেশ সহ বিশ্বের শতাধিক দেশ আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিনটি পালন করছেন । এবারে শারদীয় পূজার বন্ধেই আমরা শিক্ষক সমাজ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ দিনটি পালন করছি । এবছরের প্রতিপাদ্য বিষয়ঃ “শিক্ষার রূপান্তর শুরু হয় শিক্ষকদের দিয়ে”(The transformation of education begins with teachers) ১৯৬৬ সালের আইএলও (ILO) ও ইউনেস্কোর (UNESCO) বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর প্রথম বিশ্বশিক্ষক দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছিল । সেই থেকে প্রতিবছর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে । এই দিনটিতে শিক্ষকবৃন্দকে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মানব সম্পদ সৃষ্টি ও সমাজের উন্নয়নের জন্য তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা করা হয়। শিক্ষক যেকোন জাতির আলোক বর্তিকাস্বরূপ । মানবজাতিকে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধতায় নিবেদিত হয়ে জীবন পণ করেন শিক্ষক । শিক্ষার সূচনা পরিবার থেকে হলেও পরবর্তিতে শিক্ষকের ছোঁয়ায় তা পূর্ণতা পায় ।

পবিত্র কোরআনে নাজিলকৃত প্রথম আয়াতে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষার গুরুত্বকে শীর্ষে রাখা আছে । মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আল আমীন ইরশাদ করেন, ‘পড়! তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন । যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একবিন্দু জমাট রক্ত থেকে। আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন , ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব-শিষ্টাচার শেখো। এবং যার কাছ থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন করো, তাকে সম্মান করো।’ অর্থাৎ প্রিয়নবী শিক্ষককেই সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত করেছেন ।

মানবসভ্যতা পূর্বে যেমন ছিল আর বর্তমানে যা আছে তা তারই পরিবর্তিত রূপ। আর এই পরিবর্তন বা ক্রমবিকাশের মূলে রয়েছে শিক্ষা। মানবসভ্যতার বিবর্তনের মূলে যেমন শিক্ষার ভূমিকা রয়েছে, তেমনই শিক্ষার বিবর্তনেও মানব জাতির চাহিদার ভূমিকা রয়েছে। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই শিক্ষা গ্রহণ করে এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় ফলে সমাজ এগিয়ে যায়।

বর্তমানে আমরা ৪র্থ শিল্পবিপ্লবে (4IR) প্রবেশ করেছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যতম প্রধান প্রভাব হল মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। AI, রোবোটিক্স, ICT, 3D প্রিন্টিং এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অটোমেশনের মতো প্রযুক্তি আমাদের পেশাগত জীবনকে বাড়িয়ে তুলছে তাই, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (4IR) সম্পর্কিত দূরদর্শী উদ্যোগ নিতে হবে এখনই। মনে রাখতে হবে অতি আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ যখন মানুষের বিকল্প উদ্ভাবন করে তখন একঘেয়ে, অলস, নির্বোধ মানুষ কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়ে কর্মহীন হয়ে যায়। এ সময়ই স্বল্পপুঁজির দেশগুলোর জনগোষ্ঠী চ্যালেঞ্জ এর মধ্যে পড়ে যায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (4rt Industrial Revulation-4IR) প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জনশক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্র বা দেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা তাই দক্ষতার মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার অপার সুযোগ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের কী কী দক্ষতা অর্জন করানো প্রয়োজন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে নানা আলোচনা চলমান রয়েছে। ২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের ৪৬ তম সভায় বিশ্বের অন্যতম বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সম্পন্ন বিশ্বনেতা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দেয়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তবনা, চিন্তা–দর্শন নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা চলছে, যা “The 4rt Industrial Revelations” গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের প্রধান প্রফেসর ক্লস সোয়াব। স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নিতে হবে চলমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমাদের আভিভাবক কতটা ততপর। যে অভিভাবক ভিশন – ৪১ দেখতে পারেন এবং রূপরেখা তৈরি করেন সে অভিভাবক কতটা যুগোপযোগী, আধুনিক ও শক্তিশালী অভিভাবক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২১ শতকে তথ্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যোগ্য নাগরিক তৈরিতে হিমশিম খাচ্ছে সনাতনী পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা। গতানুগতিক শিক্ষার ধারা পরিবর্তন করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও সম্ভাবনার লক্ষ্যস্থির করে ২০২৩ সাল থেকে সমগ্র দেশে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হতে যাচ্ছে। যাতে করে শিক্ষার্থীকে টেকসই, কার্যকর সমাধান ও সম্ভাবনাপূর্ণ জ্ঞান, দক্ষতা, ও ইতিবাচক দৃষ্টি সম্পন্ন, দূরদর্শী, সংবেদনশীল, অভিযোজন-সক্ষম মানবিক এবং যোগ্য বিশ্ব-নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়। সেজন্য আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় শক্তিশালী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে এতে দেশের শিক্ষক সমাজ একনিষ্ঠ ও নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাবেন ইনশাল্লাহ!

শিক্ষার্থীকে সফল মানবসম্পদে পরিণত করতে জ্ঞান অর্জনের জন্য জ্ঞানগত দক্ষতার প্রয়োজন আবার মূল্যবোধ চর্চার জন্য মনোসামাজিক আবেগীয় দক্ষতার প্রয়োজন একই সাথে ব্যবহারিক দক্ষতা বা আবেগীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য জ্ঞানঅর্জন এবং মূল্যবোধ চর্চা খুবই জরুরী । অতএব এসব দক্ষতার বিষয়ে শিক্ষকবৃন্দকে সর্বদাই নিরলস ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিশীল হলেই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তন দক্ষতা (Creative thinking skill), সমস্যা সমাধান দক্ষতা (Problem solving skill), সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা (Decition making skill), স্ব-ব্যবস্থাপনা দক্ষতা(Self-management skill), সহযোগিতামূলক দক্ষতা (Collaboration skill), যোগাযোগ দক্ষতা(Communication skill), বিশ্ব-নাগরিকত্ব দক্ষতা(Global citizenship skill), জীবিকায়ন দক্ষতা( Employment skill), ডিজিটাল দক্ষতা ( Digital skill ) অর্জনে সহজ হবে। তবে উল্লেখিত সকল দক্ষতা অর্জনে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ, পেশাদার, দায়িত্বশীল ও নিবেদিত শিক্ষক দরকার কারণ শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার অগ্রে থাকেন শিক্ষক একারণে শিক্ষককেই আধুনিক, যুগোপযোগী শিখন-শেখানো পদ্ধতির সাথে পরিচয় ঘটাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক যেন স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে দায়িত্বশীল, সততার সাথে অর্পিত কার্যাবলী তৃপ্তির সাথে এগিয়ে নিতে পারেন, সে পরিবেশ সৃষ্টি করা বাঞ্চনীয়। এছাড়াও -

শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আশু প্রয়োজন।

শিক্ষক যেন সামাজিক দুর্বলতার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে তা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করা দরকার।

শিক্ষককে শিক্ষা গবেষনার জন্য প্রয়োজনীয় বৃত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ।

শিক্ষকের জাতীয় মানদন্ড নির্ধারণ সাপেক্ষে শিক্ষক নিয়োগ ও কয়েকটি ধাপে অন্যান্য পেশার মত পদায়নের সুযোগ থাকা দরকার যাতে শিক্ষকবৃন্দ মর্যাদাবান হন।

সর্বোপরি শিক্ষা জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক ব্যবধানকে বিসর্জন দেয়া আবশ্যক।

একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা যায় -

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং জার্মানিতে শিক্ষকবৃন্দকে সবচেয়ে মর্যাদার আসনে রাখা হয় । এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়ায়, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ভারত, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অনেক ওপরে। "এই সমীক্ষা মোতাবেক বলা যায় যে – “যেসব সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা বেশি, সেখানে সমৃদ্ধ শিক্ষার্থীও বেশী ।"

কোভিড-১৯ এর সংকট স্পষ্ট করেছে, শিক্ষকরা হলেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলের ইঞ্জিন, যাঁদের ছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত, মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান করা অসম্ভব। মহামারীটি কেবল শিক্ষা খাতের জন্যই নয়, এটি আমাদের ভঙ্গুরতা এবং আন্তঃসংযুক্ততা সম্পর্কে সচেতন করেছে এবং এটি সত্য যে আমরা ২১ শতকের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারি, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে যদি আমরা সবাই একসাথে কাজ করি।

তাই আসুন পরিবর্তনের জন্য, উন্নতির জন্য এবং একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যত তৈরি করার জন্য আজকের এই মহান শিক্ষক দিবসে ঐক্যবদ্ধ হই। সমৃদ্ধ ও সুখী পৃথিবী গড়ি।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস- সফল হোক

খুরশীদুজ্জামান আহমেদ

প্রধান শিক্ষক

কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট ।

এই বিভাগের আরও খবর