লালমনিরহাট বার্তা
রংপুরের পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে বাড়ি ঘরে আগুন লুটপাট ৪২ জনকে গ্রেফতার
রংপুর অফিসঃ | ১৮ অক্টোবর, ২০২১ ১:০৯ PM
রংপুরের পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে বাড়ি ঘরে আগুন লুটপাট ৪২ জনকে গ্রেফতার
রংপুরের পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া-বটতলা ও হাতিবান্ধা গ্রামে অন্তত ২০টি বাড়ি ঘরে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।গতকাল রোববার (১৭ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া-বটতলা ও বড়করিমপুর গ্রামে এ তান্ডব চালিয়েছে হামলা কারীরা।ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে চালানো এ হামলায় ২০-২৫টি পরিবারের বাড়িঘর আগুনে পুড়ে গেছে। গবাদিপশু, নগদ টাকা, খাদ্যসামগ্রী ও অলংকারসহ অনেক মালামাল লুট হয়েছে বলে দাবি করছেন ক্ষতি গ্রস্তরা। ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সেখানে ফাঁকা গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪২ জনকে গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য। এ ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থাগ্রহনের জন্য দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে জেলা পূজাউৎযাপন পরিষদ।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জেলার সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ কামরুজ্জামান জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোষ্টে ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে কমেন্ট করার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে কথিত এই অভিযোগে ১৫ খেকে ১৮ টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।রোববার (১৭ অক্টোবর) রাত দশটার দিকে এই ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।সহকারী পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘ভালবাসার প্রস্তাব’ নামে একটি ফেসবুক আইডির প্রোফাইল ফটোতে কাবা শরীফের ছবি ছিল। সেখানে কমেন্ট করা হয় , সেখান থেকে এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটতে পারে। পরিস্থিতি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শিরা বলেন,গতকাল রোববার ১৩ নং রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুর জেলেপাড়ায় রাত ১০টা থেকে এ তান্ডবের খবর পেয়ে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। দমকলের ৫টি ইউনিট যখন একদিকে আগুন নেভানোর জন্য মরিয়া, তখন আরেক দিকে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন হামলা কারীরা। চোখের সামনে দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়া আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যায় বেশকিছু ঘরবাড়ি ও দোকান। গবাদি পশু গুলো লুট হয়ে যাওয়ায় আহাজারি আর আর্তচিৎকারে ভারি হতে থাকে আকাশ-বাড়ি পোড়া বাতাশের রাত।
পীরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রতন চন্দ্র শর্মা বলেন, খবর পেয়ে রংপুর, মিঠাপুকর ও পীরগঞ্জের চারটি ইউনিট রাত পৌনে ১১ টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। অনেক চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রনে আসে।
বাড়িতে অগ্নিসংযোগের স্বীকার এক ভুক্তভোগী গৃহবধূ কান্নাজরিত কন্ঠে জানান “গরু একটা নিয়া গেইছে,গাড়ি পুড়ি ফেলাইসে,চাউল টাউল টাকা নিয়ো গেইছে, হামরা এলা কি করি খামো।”
আগুনে পুড়ে যায় ঐ তিন এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে থাকা নানা ধরণের মালামাল,গরু,ভ্যানসহ পুড়ে ছাই হয়ে যায় অনেক দোকানপাট। অনেক বাড়িতে চালানো হয় ভাংচুর ও লুটপাট। ঘটনার সময় আতংকে নারী পুরুষ অনেকে আশ্রয় নেয় পাশের ধানক্ষেত সহ বিভিন্ন জায়গায়।পূর্ণিমা রানী নামে একজন বলেন, হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর করে ৫০ হাজার টাকা ও একটি গরু নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক যুবক ধর্ম অবমাননাকর ছবি ফেসবুকে পোস্ট বা কমেন্ট করেছেন এমন অভিযোগে ওই যুবকের বাড়ি ঘিরে ফেলে উত্তেজনা সৃষ্টিকারীরা। এক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এরপর ভয়ে ওই যুবক সপরিবারে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে ওই যুবকের বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করে।ঘটনার পরপরই পুলিশ সুপার, র‌্যাব-১৩-এর অধিনায়ক, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। রাত ১টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পুরো ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সেখানে রাতভর উপস্থিত থাকেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিরোদা রানী রায় জানান, রোববার রাতে বটেরবাজার মাঝিপাড়ায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে আরো সময় লাগবে।
জেলা পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার জানান, যার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেই পরিতোষ কে আমরা গুরুত্ব সহকাওে খুজছি। তার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে বেশকিছু হিন্দুদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন দেয় হামলাকারীরা। ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সেখানে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
এঘটনায় ক্ষতি গ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন সহ সরকার দলীয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতি গ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া ও এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতারের প্রতিশ্রæতি দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।গতকাল সোমবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। তবে কারো নাম পরিচয় নিশ্চিত কওে নি পুলিশ।
এদিকে এ ঘটনার জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে রংপুর নগরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ বলেন, উস্কানিমূলক ফেসবুক পোস্ট নিয়ে ৫০টির মতো বাড়িঘর তারা পুড়িয়ে ফেলেছে। যারা ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি আমরা অনুরোধ জানাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ক্ষতি গ্রস্থ পরিবার গুলোর পূর্নবাসনের জন্য যা প্রয়োজন হবে তা করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।তিনি বলেন, এটি পরিকল্পিত ঘটনা। দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভুঞা, রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য, জেলা প্রশাসক আসিব আহসান, জেলা পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার সহ পুলিশ,বিজিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা ক্ষতি গ্রস্থদের পুনর্বাসন ও দোসীদের গ্রেফতারের আশ্বাস দেন।
এই বিভাগের আরও খবর