লালমনিরহাট বার্তা
সান্নিধ্য থেকে সূচনা
- গেরিলা লিডার ড. এস এম শফিকুল ইসলাম কানু : May 13, 2021, 5:17:55 PM সময়ে

সান্নিধ্য থেকে সূচনা

১৯৬৩ সালে তৎকালীন রংপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার মদনপুর বৈরাতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে প্রথম দেখেছি, তার সান্নিধ্য লাভ করেছি। মাথায় বেতের টুপি, গায়ে সাদা পাঞ্জবী, পরনে লুঙ্গি, মুখে দাড়ি মোবারক, সুন্দর ও সুঠাম দেহের অধিকারী মওলানা ভাসানী পানিতে ফু দিচ্ছেন। লম্বা সারিতে দাঁড়ানো বাংলার দরিদ্র, নি¤œ-মধ্যবিত্ত কৃষক ও শ্রমজীবি মানুষ। তাদের চিকিৎসার ব্যবসা নেই। তাই মওলানা ভাসানীর পানি পরা নিতে এসেছেন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আসায়। এটাই ছিল তাদের অন্তরের বিশ্বাস। মওলানা ভাসানী তাই তাদেরকে নিরাস করেনি। তিনি পানিতে ফু দিচ্ছেন। আবার বলছেন, তোমরা ঔষুধ কিনে খাবে। মওলানা ভাসানী কয়েকবার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় এসেছিলেন। সেখানে মওলানা ভাসানীর অসংখ্য মুরিদ রয়েছেন, যাদের অধিকাংশ বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও পাবনা জেলা থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে তিস্তা পরবর্তী কাকিনা ইউনিয়নের মহিষামুড়ি গ্রামের মানুষ দিশেহারা, তাদের ঘরবাড়ী, আবাদী জমি, শষ্যের ক্ষেত, গাছপালা ক্রমেই তিস্তা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৮ সালে এমনি পরিস্থিতিতে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তাঁর মুরিদ, অনুসারী ও ভক্তদের আহŸানে কাকিনার মহিষামুড়ি গ্রামে আসেন। তিনি তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙ্গন প্রত্যক্ষ করলেন। মুরিদ ও ভক্তদের নিয়ে নদীর তীরে গেলেন। সকলেই মিলে মওলানা ভাসানীর সাথে আল্লাহ পাকের দরবারে হাত তুলে রোনাজারি করলেন। একটু দূরে এসে একটি বাঁশের খুঁটি পুতে দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন তোমরা এ খুঁটির পিছনে বসতি স্থাপন করবে। নদী এদিকে আসবে না। সত্যিই নদী আর মহিষামুড়ি গ্রামের দিকে ধাবিত হয়নি। তাই গ্রামের মানুষগুলো আল্লাহ পাকের দরবারে মওলানা ভাসানীর জন্য দোয়া ও বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। ভক্ত বৃন্দ তাদের গ্রামে মওলানা ভাসানীর নামে খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে তারা মিলিত হন। মওলানা ভাসানী ১৯৫৮ সালের ১, ২, ও ৩ জানুয়ারি গাইবান্ধা জেলার যুনা নদীর তীরে ফুলছড়ি ঘাটের নিকটে কৃষক সম্মেলন আহŸান করেছিলেন। সম্মেলনের তৃতীয় দিনে তিনি সমিতির কমিটি ঘোষণা দেন। মওলানা ভাসানী একমাত্র নেতা, যার নেতৃত্বে কৃষক সমাজ সংগঠিত হয়েছিল। তিনি কৃষকদের মাথায় লালটুপি পড়িয়ে এবং হাতে বাঁশের লাঠি তুলে দিয়ে তাদেরকে সংগ্রামী করে গড়ে তুলেছিলন। অন্যায়, জুলুম, অবিচার, বৈষম্য, প্রভুত্ব ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে কৃষকদেরকে উজ্জ্বীবিত করেছিলেন। এই সংগঠনের কার্যক্রম সুদূর পশ্চিম পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়ে। মওলানা ভাসানীর পশ্চিম পাকিস্তান সফরের সময় বিমানবন্দরে কয়েক হাজার কৃষক মাথায় লালটুপি পড়ে তাকে সংবর্ধনা জানান। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানেই নয় পূর্ব পাকিস্তানের ৬৫ হাজার গ্রামে কৃষক সমিতির আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। পশ্চিমা শাসকদের ভীত নড়বড়ে করে দিয়েছিল সে আন্দোলন। প্রতিটি আন্দোলনে কৃষকের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। বিশেষতঃ ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে কৃষক, শ্রমিক, মজুর ও তাদের সন্তানদের অংশ গ্রহণ। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী-কর্মীর সন্তান, সুবিধা ভোগী, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, দুনীর্তিবাজ প্রভু মনোভাবাপন্ন আমলাদের সন্তান, বড় বড় ব্যবসায়ীর সন্তান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি বললেই চলে। অথচ স্বাধীন দেশে এরাই পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছেন। যে রাজনৈতিক বৈষম্য ও আমলা প্রভুত্বের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক ও তাদের সন্তানেরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছে, তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কৃষক সমিতির আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল তৎকালীন রংপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার (বর্তমান) আদিতমারী থানার) মহিষখোচা গ্রামে। সেখানে কৃষকেরা মহিষখোচা হাটের ইজারাদারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। কৃষকদের নিকট থেকে জোর পূর্বক অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাড়িয়েছিলেন। ইজারাদার ও তাদের নিয়োজিত চাটুকার ইতোর ব্যক্তিরা সংগ্রামী কৃষকদের উপর লাঠি, সোটা, বল্লম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এতে অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। এ সময় সংগ্রামী কৃষক আবদার রহমান মারা যান। মওলানা ভাসানী সন্তোষ থেকে ছুটে এসে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। লালটুপি পরিহিত কৃষকদের হাতে বাঁশের লাঠি তুলে দিয়ে ঢাকার রাজপথে লাঠি মিছিল ও জনসভার অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ২৩ নভেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত সুবিশাল জনসভায় মওলানা ভাসানী নিজেই সর্বপ্রথম বজ্রকণ্ঠে শ্লোগান দিয়েছিলেন – “স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ”। আর এ শ্লোগানই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে প্রকাশ্য প্রথম বিদ্রোহের ধ্বনী। এ ঘোষণা শুনে জনগণ সংগ্রামী চেতনায় উজ্জ্বীবিত হয়েছিলন। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতায় জনতার ব্যতিক্রমী উত্তাল চিত্র দেখে প্রখ্যাত কবি শামসুর রহমান তার ‘সফেদ পাঞ্জাবী’ কবিতা লিখেছেন- বল্লমের মত ঝলসে ওঠে তার হাত বারবার অতিক্রম স্ফীত হয়; স্ফীত হয় মৌলানার সফেদ পাঞ্জাবী।’ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী ভারতে গিয়েছিলেন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাকে দেরাদুনের সেনা নিবাসের মসজিদে নজনদারী করে রেখেছিলেন। এ সময় মওলানা ভাসানী ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে জানিয়েছিলেন-আমি তোমার পিতা জহরলাল নেহেরু ও পিতামহ পন্ডিত মতিলাল নেহেরুর সাথে রাজনীতি করেছি। আমাকে কেন নজর বন্দী করে রাখা হয়েছে। তিনি তাঁর এ প্রশ্নের উত্তর পাননি। মহান বিজয়ের পরের দিনও মওলানা ভাসানীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে? তিনি তাঁর এ প্রশ্নের উত্তর পাননি। মহান বিজয়ের পরের দিনও মওলানা ভাসানীকে বন্দি অবস্থায় দিল্লীতে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছে। পরে তিনি আসাম হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশের পুর্নবাসনে সহায়তা দেয়ার জন্য আর্ন্তজাতিক বিশ্বে আবেদন জানান। ভারত থেকে প্রায় ১কোটি বাংলাদেশী উদ্বাস্তÍ রিক্ত হস্তে, ভগ্ন স্বাস্থ্যে, ধ্বংসপ্রাপ্ত জ্বালানো পোড়ানো বসত ভিটায় ফিরে আসেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা কয়েক কোটি বিপযর্স্ত মানুষও দেশের পুর্নগঠনে তৎপর হয়ে উঠেন। ১৯৭৩ সালে মওলানা ভাসানী রংপুরে এসে কালেক্টরেট মাঠের জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি রংপুরে সেলিম ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেন। সকাল ১০টায় মওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য রংপুর থেকে প্রকাশিত বিদ্রোহী পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক আশরাফ হোসেন বড়দা সহ আমি সেলিম ভাইয়ের বাসায় যাই। সেখানে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক কাজী জাফর আহমেদ সহ কেন্দ্রীয় ও রংপুর জেলার নেতৃবৃন্দ এবং চিলমারী থেকে আগত ভক্তবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পত্রিকার প্রসঙ্গ তুলতেই মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, চীন বিপ্লবের সময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিটি কমিউন থেকে হাতে লেখা হাজার হাজার পত্রিকা প্রকাশিত হতো। মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্টির নেতা কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, জ্ঞান অর্জন ও নির্দেশনা সমূহ পালন। কাজেই পত্রিকা প্রকাশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মওলানা ভাসানী আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, এরই ফাঁকে চিলমারী থেকে আগত মুরীদকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা গ্রামের অমুক অমুক ব্যক্তি, তাদের স্ত্রী সন্তানেরা কেমন আছে। সংসার ঠিক মত চলছে কিনা? মুরীদ তার মুর্শীদের পা টিপছেন এবং প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। আমার এক প্রশ্নের উত্তরে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, যারা আমাকে ছেড়ে আন্ডার গ্রাউন্ড রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছে, তারাও এক সময় আমার অতি কাছের লোক ছিল। এরা প্রাণ বাঁচাতে গভীর রাতে আমার কাছে এসে সাহায্য চায়। আমিতো তাদেরকে না বলতে পারি না। এ পর্যায়ে তিনি কাজী জাফরকে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমি জাফর ও মেননদেরকে বলে দিয়েছি, আমি রাজনৈতিক নেতা, মওলানা, হুজুর ও পীর। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও আমার হাজার হাজার মুরীদ রয়েছে। আমি এখনও তাদের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রোগ মুক্তির জন্য কিংবা কল্যাণের জন্য পানিতে ফু-দেই। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, জনগণকে সংগঠিত ও আন্দোলনকে বেগবান করে তিস্তামূখ ঘাট পাড়ি দিয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাটে পৌঁছে দেয়া। সেখান থেকে আন্দোলনকে আরো গতিশীল করে জনগনকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তোমাদের। আমি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে তোমাদেরকে ক্ষমতায় বসাতে পারবো না। সেখানে আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় আমি বিদ্রোহী পত্রিকার বদরগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োজিত ছিলাম। রংপুরে এসেও পত্রিকার কাজ করতাম। মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে উজ্জ্বীবিত হয়ে ১৯৭৩ সালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। আজও সে পেশাতেই আছি। যা হোক; মাগরিবের নামাজের পর মওলানা ভাসানীর সাথে গাড়িতে করে রংপুরের ২ জন ন্যাপ নেতা ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের বিউটি সহ শহর ঘুরতে বের হলাম। রংপুরের ষ্টেশন রোডে গাড়ি চলছে, হঠাৎ করে বিউটি বললেন-হুজুর আমরা মিষ্টি খাবো। হুজুর পিছন ফিরে রংপুর শহরের প্রখ্যাত আইনজীবী আবুল হোসেন খানের পুত্র ন্যাপ নেতা আব্দুল হালিম খানকে জিজ্ঞাসা করলেন-এখানে আমাদের লোকের কোন মিষ্টির দোকান আছে কি? হালিম ভাই বললেন, হুজুর সামনে আমাদের পার্টির কবির ভাইয়ের রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। গাড়ী থামানো হলে হুজুর নেমে পড়লেন। কবির ভাই তার রেষ্টুরেন্টে মওলানা ভাসানীকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে কদমবুচি করলেন। আনন্দ অশ্রæতে সিক্ত হয়ে কবির ভাই বললেন-হুজুর আমি আপনার কি খেদমত করতে পারি। হুজুর বললেন, এদেরকে মিষ্টি খাওয়াও। আমরা মিষ্টি খেয়ে আবারও চলতে শুরু করলাম। শহর ঘুরে শেষে আবারও সেলিম ভাইয়ের বাসা। মওলানা ভাসানীকে জীবন প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন তাঁর নেতাকর্মী, সমর্থক, মুরীদ ও ভক্তরা। মওলানা ভাসানীর কোন অর্থকড়ি ছিল না। একবেলা খেলেন তো পরের বেলা কি খাবেন তারও নিশ্চয়তা ছিল না। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় ওনার খাবারের কোন সমস্যাও ছিল না। মুরীদ ও ভক্তবৃন্দ খাদ্য সামগ্রী নিয়ে প্রস্তুত থাকতেন। মওলানা ভাসানী শুধু খেতেন না, তিনি খাদ্য তৈরী করে নিজেই পরিবেশন করে মুরীদ ও ভক্তদের খাওয়াতেন। মানুষের দুঃখ কষ্টে তিনি অস্থির হতেন। মওলানা ভাসানী প্রভুত্বের বন্ধুত্ব নয়, ভ্রাতৃধর্মী বন্ধুত্বকে বিশ্বাস করতেন। তিনি ভারত, রাশিয়া, আমেরিকার সাথে সামরিক চুক্তির বিরোধী ছিলেন। তিনি জনগণকে অসৎ রাজনীতিকের সৃষ্ট নিকৃষ্ট ধরণের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক অপকর্ম এবং আর্থিক দূর্গতি ভোগকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাতেন, প্রতিবাদ করতেন। সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে মওলানা ভাসানী বলতেন- সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জনগণের সমস্যা সম্পর্কে সংবাদ পত্রে লিখতে দেয়া উচিত। মওলানা ভাসানী বলতেন-রবু বিয়াতের পথই অর্থাৎ সার্বজনীন মানবাধিকার ও সামগ্রীক কল্যাণের পথই সাফল্য ও শান্তির পথ। আল্লাহর শক্র অর্থাৎ শোষক, জালিম, মুনাফাখোর, চোরাকারবারী, দুর্নীতিবাজ ও দুস্কৃতকারীদের দুশমন জানুন। আল্লাহর দোস্ত অর্থাৎ যাহারা সৎভাবে জীবনযাপন করে, হালাল রোজগার করে, হক কথা বলে, শোষিত-বঞ্চিতের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করে, আল্লাহর আদেশ নিষেধ মানিয়া চলে, তাহাদিগকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করুন। আল্লাহর দোস্ত আমাদের দোস্ত। আল্লাহর দুশমন, আমাদের দুশমন। তবেই আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যাবে এবং বিজয় নিকটবর্তী। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনের মর্মকথা ছিল- “দারিদ্রকে দূর করিয়া দাও, শোষণকে নির্মূল করিয়া দাও, সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে দাও, আমার কাজ তখনই ফুরাইবে”। তাঁর সে কাজ পরবর্তীদের জন্য অসমাপ্ত রেখেই তিনি চলে গেছেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে, রেখে গেছেন অসংখ্য অনুসারী, দিয়ে গেছেন কল্যাণকর রাজনীতি ও সফল জীবনের পথ-নির্দেশনা। তাঁর সান্নিধ্য থেকেই সূচনা- আমার প্রতিবাদী জীবনের সূচনা, শোষণ ও পরাধীনতা মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের সূচনা, মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে সশস্ত্র রণক্ষেত্রে শক্রপক্ষকে পরাস্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ কলম সৈনিক জীবনের সূচনা, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক ও জীবন দর্শন নিয়ে নতুন করে ভাবনার সূচনা, আর এ ভাবনা থেকেই তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সূচনা, পিএইচ.ডি গবেষণার সুযোগ প্রাপ্তি, অবশেষে অভিসন্দর্ভ আকারে তা সন্নিবেশ করণ ও উপস্থাপন। গবেষণাকর্মটি সম্পাদনে যাদের ঐকান্তিক সহযোগীতা পেয়েছি তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে কৃতজ্ঞা জ্ঞাপন করছি। সর্বজনাব মওলানা ভাসানী গবেষক ও সাপ্তাহিক হক-কথা’র সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী (টাঙ্গাইল), মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র হাসরত খান ভাসানী (টাঙ্গাইল), প্রফেসর মোহাম্মদ হোসেন (টাঙ্গাইল), প্রফেসর ড. এম.এন.হক (ঢাকা), প্রফেসর ড.এম.এ.রহিম (ঢাকা), মওলানা ভাসানী গবেষক ও সাপ্তাহিক হক-কথা’র বার্তা সম্পাদক মাহবুব-উল আলম (চট্রগ্রাম), সহকারী অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল কালাম আজাদ (রংপুর), বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থার প্রাক্তন মহাব্যবস্থাপক এম.এ.হাকিম (লালমনিরহাট), কবি ও গবেষক ড. মোঃ আশরাফুজ্জামান মন্ডল (লালমনিরহাট) সহ আমার সহায়ক বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। এছাড়াও গবেষণাকর্মটি তথ্য-সমৃদ্ধ করতে যাদের মূল্যবান গ্রন্থ, স্মরণিকা, প্রতিবেদন ও গবেষণা প্রবন্ধের সহায়তা গ্রহণ করেছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যাদের মূল্যবান লেখা বা সংগৃহীত তথ্য এ গবেষণাকর্মে সংযুক্ত করেছি তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে ঋণ স্বীকার করছি। সর্বোপরি গবেষণাকর্মটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেয়ায় গৌরব প্রকাশন এর স্বত্বাধিকারী জনাব স.ম.ইফতেখার মাহমুদ এর নিকট বিশেষভাবে ঋণ স্বীকার করছি। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সান্নিধ্য লাভের স্মৃতি বুকে ধারণ করে গবেষণাকর্মটি সমৃদ্ধ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হয়েছি তা জানিনা, তবে আত্মতৃপ্তি এতেই যে, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার ও জানানোর সুযোগ পেয়েছি। ভুল-ক্রটি মার্জনীয়। লেখক : লালমনিরহাট বার্তা পত্রিকার সম্পাদক