লালমনিরহাট বার্তা
চামড়া শিল্পে ধস- দায়ী কে ??
ইয়ার আলী | ২২ জুন, ২০২৪, ৪:৪৪ AM
চামড়া শিল্পে ধস- দায়ী কে ??

একটা দেশের অর্থনীতিতে কত যে উইং থাকে,সেটা সাধারণত পরিসংখ্যানে তুলে ধরা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্য কৃষি উৎপাদন হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, চামড়া শিল্প,বাংলাদেশের অর্থনীতির এক একটি অঙ্গ হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে সমস্ত খাত চলমান রয়েছে তারমধ্যে চামড়া একটি অন্যতম অর্থনৈতিক খাত। এই খাতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে কিন্তু হঠাৎ করে এই খাতের অধঃপতন কি কারনে ঘটলো তার প্রকৃত তথ্য কেউ তুলে ধরছে না।সবাই নিজের নিজের স্বার্থে তথ্য প্রদান করে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে এক সময় কাঁচা চামড়া বিদেশি সরাসরি রপ্তানি হত সেখান থেকে সরকার অধিক আয়ের জন্য কাঁচা চামড়াকে পাঁকা চামড়ায় রূপান্তর করে বিদেশে রপ্তানির আইন তৈরি করে। সেই আইনের পর থেকেই বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি হ্রাস পেতে থাকে।পাঁকা চামড়া বিদেশিরা হয়তো ক্রয় করে তেমন লাভ করতে পারেনা বিধায় বাংলাদেশ থেকে চামড়া ক্রয়ের ব্যাপারে আস্তে আস্তে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।অপরদিকে কাঁচা চামড়া রূপান্তরিত করে পাঁকা চামড়া হিসেবে রপ্তানি করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটার মধ্যে নানা রকম দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কাজ করছে ।বাংলাদেশে চামড়া শিল্প খাতের এই অধঃপতনের জন্য আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে তা জনসম্মুখে তুলে ধরার চেষ্টা করতে করলাম।(১) কাঁচা চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন আমার মনে হয় একটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে চামড়া রপ্তানি ক্ষেত্রে। যেহেতু এদেশে চামড়া প্রক্রিয়া করার জন্য যে সমস্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়,সেই কেমিক্যাল এর দাম অনেক বেশি এবং সেই কেমিক্যাল সমূহ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।আমদানিকৃত কেমিক্যাল দিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রপ্তানি করতে চাইলে যে মূল্য বা খরচ পড়ে সে মূল্যে বিদেশীরা চামড়ার ক্রয় করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।যেহেতু আমদানিকারী দেশ সমূহ চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কেমিক্যাল উৎপাদনকারী দেশ,তাই তাদের দেশের কেমিক্যাল দিয়ে তারা নিজেদের দেশেই চামড়া প্রক্রিয়া করলে যে খরচ হয়,দেশে সেই কেমিক্যাল দিয়ে প্রক্রিয়াকরণ করে আবার তাদের দেশেই কিনে নিয়ে যেতে দাম বেশি পরে যায়, ফলে বাংলাদেশ থেকে চামড়া ক্রয়ে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।(২) চামড়ার বিকল্প হিসেবে সিন্থেটিক লেদার নামে যে পদার্থটি চায়না এবং অন্যান্য দেশসমূহ আবিষ্কার করেছে আমাদেরকে সেই সিনথেটিক লেদারের টেকসই এবং পরিবেশগত ভারসাম্যতা,মূল্য এবং ব্যবহারের সুবিধা সমূহ বিবেচনা করে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা উচিত ছিল বলে মনে হয় কিন্তু এক্ষেত্রে এই সমস্ত বিষয়ে একত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে মনে হয় না।(৩) বাংলাদেশে ব্যবহার উপযোগী সিন্থেটিক লেদারকে নিষিদ্ধ করে দিলে হয়তো দেশের অভ্যন্তরে চামড়ার ব্যবহার বৃদ্ধি পেত, সেটাও বিবেচনা করা হচ্ছে না। সেন্থেটিক লেদার অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এবং দেশে চামড়ার বাণিজ্যিক ব্যবহারকে তথা জুতা কারখানা সমুহ বা চামড়ায় সঙ্গে সংযুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ আর বাণিজ্যিকভাবে সফলতা অর্জন করতে পারছে না। বিধায় তারা চামড়া ছেড়ে সিন্থেটিক লেদারের দিকে চলে যাচ্ছে। দেশীয় বাজারে চামড়ার চাহিদা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।(৪) বাংলাদেশের চামড়ার ইন্ডাস্ট্রি সমূহ যে জায়গায় অবস্থান করছে, সেই জায়গা সম্বন্ধে নানা রকম নেগেটিভ তথ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্যতা সম্বন্ধে পরিকল্পিতভাবে নেগেটিভ তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।ফলে সেই জায়গাতেই ব্যবসায়ীরা যেতে চাচ্ছেনা। অপরপক্ষে যে উদ্দেশ্য নিয়ে চামড়া শিল্প কারখানা গুলো স্থানান্তর করা হয়েছে ,সেই স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় প্রচন্ড পরিমাণে আর্থিক কেলেঙ্কারি জনিত কারণে রাস্তাঘাট কাঁদা বালু মাটিতে পরিপূর্ণ থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুপযুক্ত করে রাখা হয়েছে ।মানুষের মনে এই শিল্প এলাকার পরিবেশ সম্বন্ধে একটা নেগেটিভ ধারণা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে বিদেশী ক্রেতারা সেখানে যেতে আগ্রহ ফিল করছে না।এটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র কিনা তা পরীক্ষা করার মত যন্ত্র আমাদের রাষ্ট্রে আছে বলে মনে হয় না।চামড়ার শিল্পের পতনের কারণে বাংলাদেশের যে সমস্ত সেক্টর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ।সরকার সেই সমস্ত ক্ষতিগুলোকেও হয়তোবা একত্রে যোগ করতে পারছে না।যে কারণে রাষ্ট্রীয় মোট ক্ষতির পরিমাণ এবং মোট আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। নিচে চামড়া শিল্পের সরাসরি উপকার ভোগী অথবা ক্ষতিগ্রস্ত খাতসমূহের একটি বর্ণনা তুলে ধরলাম।(১) বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ যেহেতু মুসলমান। আর ঈদ হলো মুসলমানদের প্রধানতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বছরে দুইবার ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিশাল অর্থনৈতিক জগৎ পরিচালিত হয়ে থাকে। এই অর্থনৈতিক জগতের সার্বিক চিত্র লিখিত আকারে তুলে ধরা সম্ভব নাহলেও সামান্য কিছু জনসাধারণের বিবেচনার জন্য তুলে ধরা হল:-কোরবানিকে ঘিরে কোটি মানুষ কোরবানির পশু পালন করছে,কেউ কোরবানির জন্য ছুরি, বটি, চাপাতি তৈরী করছে,কেউ কিনছে,কেউ আবার গাছের গুঁড়ি, মাদুর,দড়ি, খড়, ভূষি, খৈল তৈরী ও বিক্রি করছে। কেউ ঈদের জন্য সেমাই, চিনি, দুধ, মসলার কেনা বেচা করছে,গরু পালনের জন্য অনেক বেকারের কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে। শুধু কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে ৬০ হাজার কোটি টাকার কোরবানির পশু ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে,তার মধ্যে ঢাকা শহরেই বিশ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে।(২) কোরবানির ঈদে প্রায় এক কোটির বেশি গরু,ছাগল,ভেড়া,উট,দুম্বা কোরবানি হয়ে থাকে। গড়ে প্রতি চামড়া এক হাজার টাকা হলেও এক হাজার কোটি টাকার চামড়াব্যবসা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। মাত্র একদিনে এক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা একটা দেশের বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেন কিন্তু দুর্ভাগ্য এই লেনদেনে এখন অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছে।বাংলাদেশে শিল্পের ধসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষসমূহের সামান্য কিছু তুলে ধরা হলো:-(১) ঈদের কোরবানির চামড়া কোরবানি দাতা ভোগ করতে পারেনা বিধায় দান করতে হয়। তাই চামড়া বিক্রির সমুদয় অর্থ অর্থাৎ ১-২ বিলিয়ন টাকার চামড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন দুস্থ গরিব মিসকিন অসহায় এবং মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো পেয়ে থাকে। সরকারিভাবে এক থেকে দুই বিলিয়ন টাকা মাত্র তিন দিনের মধ্যে বিতরণ করা অসম্ভব বা দেওয়া সম্ভব হয় না।বাজেটে যদিও অসহায় দুঃস্থ গরিব লোকদের জন্য কিছু টাকা ধরা হয় কিন্তু সারা বছর ধরে এই টাকাও তাদের ঘরে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।অথচ ঈদের মাত্র একদিন বা দুই দিনের মধ্যেই সমুদয় টাকা এই সমস্ত গরিবদের কাছে সরাসরি পৌঁছে যায়।এতে প্রত্যক্ষভাবে তারা উপকৃত হয় এবং তাদেরও ঈদ আনন্দ আরও আনন্দময় হয়ে ওঠে। বর্তমানে চামড়া শিল্পের ধসের ফলে বাংলাদেশের এক থেকে দুই বিলিয়ন টাকা কমে ১০০ কোটি টাকাও এখন গরিব অসহায় এতিম এবং মাদ্রাসাগুলোতে যাচ্ছে না।ফলে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান এখন আর চলমান রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে অথচ এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য সরকারকে ওই সমপরিমাণ ঢাকা ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করা দরকার হয়ে পড়েছে। ভর্তুকির টাকা সরকার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় গরিবরা এই খাত থেকে সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ এই খাতের সমুদয় অর্থ বিদেশে চামড়া বিক্রি করে আয় করা হতো।এই বিক্রি লব্ধ অর্থই এদেশের গরীব অসহায় লোকদের মধ্যে চলে যেত মাঝখানে ব্যবসায়ীর একটা বড় ধরনের লাভ করে তাদের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখত। আজ তার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত।(২) চামড়া শিল্পে নিয়োজিত ব্যবসায়ী,কর্মচারী,কেমিক্যাল আমদানি কারক,শিল্প কারখানায় বিনিয়োগকৃত ব্যাংক সমূহ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরে পরিণত হয়েছে। ফলে এই সেক্টরের উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের বৃহত্তম একটি জনগোষ্ঠী আজকে আয় থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রায় বেকার হয়ে পড়ে যাচ্ছে। এই বেকারত্বের ভার বাংলাদেশ সরকারকে সামলাতে হবে।(৩) বাংলাদেশ যেখানে চামড়া এবং চামড়া জাতীয় দ্রব্যসমূহ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত উল্টো সেখানে এখন বিদেশ থেকে সিন্থেটিক লেদার সহ জুতা স্যান্ডেল আমদানি করে পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশি অর্থ বিদেশে প্রেরণ করা হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং হলে দেশের রিজার্ভ কম যাচ্ছে।(৪) বাংলাদেশের লেদার ইন্ডাস্ট্রি গুলোকে চালু রাখার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় লেদার ইনস্টিটিউট অথবা লেদার টেকনোলজি নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে তা বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে কারণ এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ শিক্ষিত হয়ে চাকরি পাচ্ছে না বিধায় এই সেক্টরে আর কেউ লেখাপড়া করার মত আগ্রহ দেখাচ্ছে না।ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাবাংলাদেশ যতদিন থাকবে অথবা এই ভূখণ্ডে যতদিন মুসলমান থাকবে ততদিন ঈদ আসবে,কোরবানি হবে,আমরা চামড়ার তৈরি জুতা স্যান্ডেল কাপড় পরবো। অতএব এই সেক্টরে এমন কোন হতাশা আনা উচিত হবে না,যে হয়তো একদিন চামড়া পাওয়া যাবে না । কাঁচামাল হিসেবে চামড়া যেহেতু নিশ্চিত পাওয়া যাবে তাই এটি সেক্টরের ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনা করা যাবে।শুধু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা,উপযুক্ত পরামর্শ এবং বিদেশ নির্ভরতা কমালে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনলে হয়তো সেক্টরটি যুগ যুগ ধরে চলতে পারে ।বাংলাদেশ অর্থনীতির একটি সোনালী শাখা সারা জীবন চালু রাখা সম্ভব হবে এই প্রত্যাশায় ।

লেখক : ইয়ার আলী, প্রোপাইটার আলিবাবা থিম পার্ক ও আলী ফ্রুটস এন্ড ভেজিটেবিল কোল্ড স্টোরেজ।  

এই বিভাগের আরও খবর