বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ বিনোদন

‘খালেদা জিয়া বললেন, ওরা এই বাড়িতেই খাবে, আমরা যা খাই তাই খাবে’


প্রকাশ :

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ দেশ। সেই শোকের আবহে তাকে ঘিরে স্মৃতিচারণ করেছেন দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের ভোকালিস্ট হামিন আহমেদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি তুলে ধরেছেন খালেদা জিয়ার মানবিকতা, আন্তরিকতা ও ব্যক্তিত্বের কিছু কম জানা মুহূর্ত।

ফেসবুক পোস্টের শুরুতেই হামিন লেখেন, ‘এর আগে কখনও বলা হয়নি, আজ শেয়ার করছি।’ এরপর তিনি ফিরে যান ১৯৯৩–৯৪ সালের স্মৃতিতে। সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মাইলস ব্যান্ডকে তার সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাসভবনে সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

হামিন জানান, সে সময় মাইলসের সদস্য ছিলেন তিনি নিজে, শাফিন আহমেদ, মানাম ও সম্ভবত মাহবুব। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন—এই খবরেই তারা রোমাঞ্চিত ও কিছুটা নার্ভাস ছিলেন। বাসভবনে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান ও তার বন্ধুরাও। সেদিনই প্রথমবারের মতো খালেদা জিয়ার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয় হামিনের।

হামিন লিখেছেন, খালেদা জিয়া ছিলেন অভিজাত, মার্জিত ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তবে সেই সঙ্গে তাদের সঙ্গে এমন আন্তরিকভাবে কথা বলেন যে সবাই মুগ্ধ হয়ে যান। অনুষ্ঠানের আগে দুপুরে নিয়ম অনুযায়ী সাউন্ড চেক করতে করতেই দুপুরের খাবারের সময় চলে আসে। তখনই ঘটে সেই স্মরণীয় ঘটনা।

তিনি লেখেন, দুপুরের খাবারের সময় পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা মাইলস সদস্যদের অন্য কোথাও খাওয়াতে চাইলে খালেদা জিয়া নিজেই আপত্তি জানান। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘না, ওরা এই বাড়িতেই খাবে। আমরা যা খাই, ওরাও তাই খাবে।’

এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে আরও বিস্মিত হন মাইলসের সদস্যরা। খালেদা জিয়া নিজ হাতে তাদের প্লেটে খাবার তুলে দেন। হামিন লেখেন, সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল—এটা কি সত্যিই ঘটছে? দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তার এমন বিনয়, মানবিকতা ও সম্মানবোধ গভীর শ্রদ্ধায় ভরিয়ে দেয় তাদের হৃদয়।

সন্ধ্যায় গান পরিবেশনের সময় খালেদা জিয়া পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন এবং শেষে গানগুলোর প্রশংসাও করেন। সেই দিনের স্মৃতি শুধু শিল্পীদের মধ্যেই নয়, তাদের পরিবারেও গভীর ছাপ রেখে যায় বলে উল্লেখ করেন হামিন।

হামিন ও শাফিন আহমেদ জন্মেছেন এক ধ্রুপদী সংগীত পরিবারে। তারা বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ফিরোজা বেগম ও সুরকার কমল দাশগুপ্তের সন্তান। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ফিরোজা বেগম মারা গেলে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন খালেদা জিয়া। অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি ঢাকার ইন্দিরা রোডের কালিন্দী অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ান।

হামিন লেখেন, সে দিন খালেদা জিয়া তাদের সঙ্গে বসে ফিরোজা বেগমের স্মৃতি শোনান, পরিবারকে সান্ত্বনা দেন একেবারে আপনজনের মতো। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ, মার্জিত ও মানবিক হৃদয়ের মানুষ—এমনটাই উঠে আসে হামিনের লেখায়। কাকতালীয়ভাবে খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে ‘ফিরোজা’ নামের একটি বাড়িতে—এ কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

দীর্ঘ অসুস্থতার পর গত ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া মারা যান। তার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শোকবার্তায় ভরে ওঠে। রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানান তাকে। পরদিন তার জানাজায় নেমে আসে মানুষের ঢল।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া টানা ৪১ বছর বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ছিলেন পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধীদলীয় নেতা। তার রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত মানবিকতার এই স্মৃতিগুলোও এখন জায়গা করে নিচ্ছে মানুষের হৃদয়ে।