বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ বিনোদন

‘ধুরন্ধর’ কেন শুধু হিট সিনেমা নয়, বিতর্কেরও কেন্দ্রে


প্রকাশ :

মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে দাপট দেখাচ্ছে আদিত্য ধরের নতুন ছবি ‘ধুরন্ধর’। প্রতিদিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আয়। কিন্তু সাফল্যের এই গল্পের পাশাপাশি সমান তালে বাড়ছে বিতর্কও। কেউ ছবির গল্পে বাস্তব চরিত্রের ছায়া খুঁজে পাচ্ছেন, কেউ আবার এর বক্তব্য ও উপস্থাপন নিয়ে তুলছেন প্রশ্ন। এমনকি সমালোচনা করায় অনলাইনে আক্রমণের মুখে পড়ে রিভিউ সরিয়েও নিতে হয়েছে একাধিক সমালোচককে। তাহলে কী আছে এই সিনেমায়, যা এত আলোচনার জন্ম দিচ্ছে?

গল্পের শুরু ১৯৯৯ সালের কান্দাহার বিমান ছিনতাই দিয়ে। এরপর একে একে উঠে আসে ভারতের সংসদ ভবনে হামলা ও ২৬/১১ মুম্বাই হামলার প্রসঙ্গ। ছবিতে দেখানো হয়, পাকিস্তানের মদদে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারতে নাশকতা চালাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রচলিত পথ ছেড়ে নেয় ভিন্ন কৌশল। সেই সূত্রেই এজেন্ট হামজাকে, যিনি চরিত্রে রণবীর সিং, পাঠানো হয় পাকিস্তানের করাচির লিয়ারে। লক্ষ্য একটাই—ভেতর থেকে সিস্টেম ভেঙে সন্ত্রাসের শিকড় উপড়ে ফেলা। কিন্তু এই মিশন সহজ নয়, প্রতিটি ধাপে তাকে মোকাবিলা করতে হয় নতুন বিপদের।

অ্যাকশন, টানটান থ্রিল আর অভিনয়ের দিক থেকে ছবিটি প্রশংসা পেয়েছে। অনেকের মতে, বাণিজ্যিক সিনেমার কাঠামোর মধ্যেই ‘ধুরন্ধর’ যেভাবে ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যু তুলে ধরেছে, তা বলিউডে খুব একটা দেখা যায় না। রণবীর সিংয়ের পাশাপাশি ছবিতে রয়েছেন অক্ষয় খান্না, সঞ্জয় দত্ত, আর মাধবন, অর্জুন রাজপাল ও সারা অর্জুন।

বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে অক্ষয় খান্নার অভিনীত রেহমান ডাকাত চরিত্রটি। অনেক দর্শকের দাবি, এটি কুখ্যাত পাকিস্তানি মাফিয়া রেহমান ডাকাতের আদলে তৈরি। যদিও নির্মাতারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি। বাস্তবে রেহমান ডাকাতের আসল নাম ছিল সর্দার আবদুল রেহমান বালুচ। অল্প বয়সেই অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শক্তিশালী চরিত্রে পরিণত হন তিনি।

আরেকটি বড় বিতর্কের জায়গা রণবীর সিংয়ের হামজা চরিত্র। অনেকেই মনে করছেন, এটি প্রয়াত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর মোহিত শর্মার আদলে গড়া। মুক্তির আগেই অভিযোগ ওঠে, তার জীবনের ঘটনাবলি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েও যথাযথ কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি। মেজর শর্মা ২০০৪ সালে ‘ইফতিখার ভাট’ ছদ্মনামে হিজবুল মুজাহিদীনের দলে ঢুকে সফল অভিযান চালিয়েছিলেন, যার জন্য তিনি সেনা মেডেল পান। তার পরিবার নাকি দিল্লি হাইকোর্টে ব্যাখ্যা চেয়েছে। পরে পরিচালক ও সার্টিফিকেশন বোর্ড স্পষ্ট করে জানায়, ছবিটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জীবনের ওপর ভিত্তি করে নয়।

পাকিস্তানি বিশ্লেষক ও দর্শকদের একাংশের অভিযোগ, সিনেমায় চরিত্র ও পরিস্থিতি অতিরঞ্জিতভাবে দেখানো হয়েছে। তাদের মতে, করাচির গ্যাং দ্বন্দ্ব মূলত স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফল, যেভাবে সিনেমায় দেখানো হয়েছে তা একপেশে। বরাবরের মতোই বলিউডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতিনায়কোচিতভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা এখানেও রয়েছে বলে দাবি তাদের।

সমালোচনার আরেক দিক অতি জাতীয়তাবাদ ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই কারণেই কেউ কেউ ছবিটিকে নেতিবাচক রেটিং দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেই শুরু হয় আরেক বিতর্ক। যারা সমালোচনা করেছেন, তাদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে অনুপমা চোপড়া ‘দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া’ থেকে নিজের ভিডিও রিভিউ সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।

অনুপমা চোপড়া তার রিভিউতে উল্লেখ করেছিলেন, বাস্তব ঘটনার আসল রেকর্ডিং ব্যবহার করে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণ কিছু জায়গায় অগোছালো হয়েছে। তার এই মতের বিরোধিতা করেন অভিনেতা পরেশ রাওয়ালসহ অনেকে। যদিও রিভিউ সরিয়ে নেওয়ার পর অনুপমা এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি। একই ধরনের ট্রলের মুখে পড়েছেন সুচারিতা ত্যাগী ও রাহুল দেশাইয়ের মতো সমালোচকরাও।

সব মিলিয়ে ‘ধুরন্ধর’ এখন শুধু একটি সফল সিনেমা নয়, সমসাময়িক রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, শিল্পের স্বাধীনতা ও সমালোচনার সীমা—সবকিছুকে ঘিরে এক বড় বিতর্কের নাম।