সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব কোথায়?


প্রকাশ :

"বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। আমাদের সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন," ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

এরপর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে, শেষ হতে চলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকাল। কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি উপদেষ্টাদের কারো সম্পদের তথ্য।

অথচ আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটির অবসান ঘটবে বলেই প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকে।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের প্রত্যাশা জন্মেছিল যে, অধ্যাপক ইউনূসের সরকার বাংলাদেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটতে দেখা যায়নি। উল্টো, একাধিক উপদেষ্টা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানান অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে।

"এটা খুবই দুঃখজনক। যারা জবাবদিহিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের অস্বচ্ছ কর্মকাণ্ড দেশবাসী মোটেও প্রত্যাশা করেনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে'র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

স্বচ্ছতার নজির স্থাপনে অন্তর্বর্তী সরকারের এই ব্যর্থতা আগামীর বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

"এরকম একটি অরাজনৈতিক সরকার, যেখানে বিশিষ্টজনেরা সরকারের ভেতরে রয়েছেন, তারা যখন জনগণের কাছের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও নিজেদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করে আগামী দিনের রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটা খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। আগামীর মন্ত্রি-আমলাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করার একটা উছিলা তৈরির সুযোগ করে দিয়ে গেলেন, যা আরও হতাশাজনক," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

আশ্বাস দেওয়ার পরও সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের নিয়ে সন্দেহ তৈরির অবকাশ রয়ে যাবে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

"অতীতের সরকারগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে এর একটাই কারণ আমরা অনুমান করতে পারি। সেটা হচ্ছে, উপদেষ্টারা সম্ভবত অনেক অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। সেই তথ্য প্রকাশ করলে মানুষ নানান আলোচনা করবে, প্রশ্ন তুলবে- এমন ভয় বা দুর্বলতা হয়তো তাদের মধ্যে কাজ করছে। তা না হলে সম্পদের তথ্য প্রকাশ করছেন না কেন?" বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

উল্লেখ্য যে, গত ১৭ মাসে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তিনজন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন এবং একজন মারা গেছেন।

তাদের মধ্যে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনীয় হলফনামায় নিজের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেছেন। বাকিদের সম্পদের তথ্য এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে।

নীতিমালায় কী আছে?

প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের পহেলা অক্টোবর উপদেষ্টাদের আয় ও সম্পদ বিবরণীর বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে সরকার।

'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪' শীর্ষক ওই নীতিমালায় দু'টি ধারা রয়েছে।

প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরের ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে।

প্রসঙ্গত, জুন মাসে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর থেকেই যেকোনো সময় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যায়। তবে বাংলাদেশে সচরাচর ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হয়। তবে এ বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কয়েক দফায় সময় বাড়ানোর পর সবশেষ ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিটার্ন জমার সুযোগ রেখেছে।

এক্ষেত্রে উপদেষ্টাদের স্ত্রী বা স্বামী'র আলাদা আয় বা সম্পদ থাকলে, সেগুলোর বিবরণীও প্রধান উপদেষ্টার কাছে একইসঙ্গে জমা দিতে বলা হয়।

তথ্যগুলো হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা নিজ বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে সেসব তথ্য প্রকাশ করবেন বলে নীতিমালার দ্বিতীয় ধারায় উল্লেখ করা হয়।

নীতিমালাটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা পরবর্তী সরকারের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করে দিয়ে যাবেন বলে আশা করেছিলেন অনেকে।

"এই সরকারের উপদেষ্টারা নিজেরাই অতীতে লম্বা সময় ধরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলেছেন। ফলে আমরা আশা করেছিলাম যে, তারা সেটার একটা উদাহরণ সৃষ্টি করে যাবেন। সেই সুযোগ তাদের হাতে ছিল, যা এখন হাতছাড়া হতে চলেছে," বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধিকারকর্মী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা।