রংপুরের বদরগঞ্জে উপজাতি রুখিয়া রাউতের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম
রংপুর অফিস: শ্বাসরোধে হত্যার শিকার কারমাইকেল কলেজের ইতিহাস অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি সম্প্রদায়ের রুখিয়া রাউতের বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জের রামনাথপুর মিশনপাড়ার সাওতাল পল্লীতে চলছে শোকের মাতম। তারা নৃশংস এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের মৃত্যুদন্ড দাবি করেছেন। এদিকে এ ঘটনায় ডায়েরীর পাতায় প্রেমিক আনিছুল সম্পর্কে ওই তরুনী বেশ কিছু বিষয়ে লিখে যান। সেই সূত্র ধরেই পুলিশ এ ঘটনার ক্লু উদ্ধার করেছে। বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় বাড়ি থেকে কৌশলে ডেকে নিয়ে প্রেমিক তাকে হত্যা করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রংপুরের বদরগঞ্জের মিশনপাড়ার সাওতাল পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে সেখানকার অধিবাসিরা শোকে মূহ্যমান হয়ে গেছেন। একজন অনার্স পড়–য়া শিক্ষার্থী রুখিয়া রাউতকে নিয়েছিল তাদের অনেক আশা। কিন্তু নৃশংস এই হত্যাকান্ড তাদের অবাক করে দিয়েছে।
রুখিয়ার পিতা দীনেশ রাউত জানান, আমার গ্রামের আশার আলো ছিল আমার মেয়ে রুখিয়া রাউত। গ্রামের সবার আশা ছিল উচ্চ শিক্ষিত হয়ে এই গ্রামকে উঁচু করবে সারা বাংলাদেশে।  আমার মেয়ে ছিল অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। কিন্তু তারা আমার মেয়ের মনের আশা পূরণ করতে দিল না। শয়তানেরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করল। আমি চাই আমাদের দেশের নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার আবেদন যেভাবে আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, আমি যেমন আমার মেয়ের লাশ দেখেছি, শয়তারদেরও যেন সেভাবে ফাঁসির মঞ্চে লাশ হয়।
মা সুমতি রাউত বলেন, যারা আমার মেয়েকে এভাবে হত্যা করলো তাদেরকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়ে মারতে হবে। তা না হলে আমার শিক্ষিত মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে না।
ওই পল্লীর গীর্জা প্রধান সীমা রাউত জানান, মেয়েটা লেখাপড়ায় ভালো ছিল, তার আদব কায়দা ভালো ছিল। আমাদের জাতের সে একটা গৌরব ছিল। আমাদের জাতে একটাই শিক্ষিত মেয়ে ছিল, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতাম। কিন্তু তাকে যেভাবে হত্যা করা হলো, সেটা আমাদের ভাবনাতেই ছিল না। কিন্তু তারা মেয়েটাকে এভাবে নির্যাতন করার পর হত্যা করলো, আমরা তাদের ফাঁসি চাই।
এদিকে রুখিয়া রাউতের লেখা একটি ডায়েরী পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। সেখানে আনিছুল নামের এক ছেলের সাথে ২০১৭ সালের ১১ জুলাই থেকে পরিচয় ও সম্পর্কের বিষয়ে লেখা আছে। আরও লেখা আছে আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমার সাথে ছলনা করে গেলো। এটা ২০২০ সাল অর্থাৎ ২০১৭ থেকে ২০ সাল পর্যন্ত ওর সাথে আমার সম্পর্ক। তিন বছর ধরে ও ইচ্ছেমত আমাকে ব্যবহার করেছে। অনেক কাঁদিয়েছে, অনেক কষ্ট দিয়েছে আমাকে। তিন বছর পর ও অন্য মেয়েকে বিয়ে করে আমাকে এড়িয়ে চলবে এটা কি মেনে নেয়া সম্ভব? এটা কি অন্যায় নয়? অবশ্যই অন্যায়। আর এই অন্যায় ক্ষতি আমি মেনে নিতে পারিনি। এমন নস্ট জীবন নিয়ে আমার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া আনিছুল নিজেই আমাকে মরে যেতে বলেছে। তাই আমি মরে গেলাম। আমার এই সর্বনাশ ও মৃত্যুর জন্য পুরোপুরি আনিছুল দায়ী- রুখিয়া রাউত’
এছাড়াও ওই ডায়েরীতে আরও বিভিন্ন ধরনের বিষয় লেখা ছিল। পুলিশ ডায়েরীর সূত্র ধরে এই হত্যাকান্ডের ক্লু উদ্ধারে অনেক দুর এগিয়েছে। এদিকে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার গত ৭ অক্টোবর বিকেলে রুখিয়ার বাড়িতে গিয় পরিবারে লোকজনকে সান্তনা দেন।
বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান জানান, নির্মম এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসির সাথে কথা হয়েছে। হত্যাকারীদের তারা গ্রেফতারও করেছেন। এছাড়াও জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় রুখিয়ার পরিবারকে ১০ হাজার টাকা ও শুকনা খাবার দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
পাবর্তীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোখলেছুর রহমান জানান, ইতোমধ্যেই এ ঘটনার প্রধান আসামী  আনিছুল রহমান (২৮) ও হত্যাকান্ডে জড়িত অটোচালক রাজ মিয়া (২৫) ও আশিকুজ্জামান (৪০) কে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা ১৬৪ ধারায় দিনাজপুরের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে।
পুুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রেমিক আনিছুল একমাস আগে বিয়ে করেছে। কিন্তু রুখিয়া রাউতের সাথে তার সম্পর্ক ছিল তিন বছর। বিয়ে করা নিয়ে দুইজনের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হচ্ছিল। এরই মধ্যে রুখিয়া রাউত আনিছুলকে জানিয়েছে ওই বউকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করতে, তা না হলে বাড়িতে গিয়ে উঠে বিষপানে আত্মহত্যা করবে। এতে বিচলিত হয়ে যায় আনিছুল এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৫ অক্টোবর রুখিয়াকে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনার জন্য ডাকে। পরে তাকে অটো রিকশায় তুলে আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর পাবর্তীপুরের পাচপুকুর এলাকায় রাস্তার ধারে ফেলে যায়। এ ঘটনায় গ্রাম পুলিশ আব্রাহাম মিনজি বাদি হয়ে থানায় মামলা করেন।
বিভাগীয় বার্তা- এর অন্যান্য খবর