৩০০ বর্গ কিলোমিটারের প্রথম বাংলাদেশ ও এক ডাক্তারের গল্প
সায়েদুল ইসলাম মিঠু: বর্তমান লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার পুরোটা এবং হাতীবান্ধা উপজেলার ঠ্যাংঝারা সহ কিছু এলাকা মিলে আনুমানিক ৩০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম থেকেই সম্পূর্ণরুপে মুক্ত ছিল। পাটগ্রাম উপজেলার ভৌগলিক অবস্থান এবং বড়খাতা পর্যন্ত রেল লাইন তুলে ফেলায় পাকসেনারা আর এই উপজেলায় প্রবেশ করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর পরই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই পাটগ্রামেও সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের সদ্য নির্বাচিত এমপিএ জনাব আবিদ আলী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এবং সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আসা ছাত্রলীগ নেতা কাজী নুরুজ্জামান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। মার্চের ২৫ তারিখের গণহত্যার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এমপিএ আবিদ আলী সাহেব ২৬ তারিখ সকালে পাটগ্রাম টি এন হাইস্কুল মাঠে পাটগ্রামের সর্বস্তরের জনগণকে নিয়ে একটি জনসভা করেন। সভায় পাটগ্রামের ইপিআর এর প্রধান বোরহান সুবেদার এবং পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব কায়েতুল্লাহ সহ তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রায় সকল বাঙালী কর্মকর্তা কর্মচারিরা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে তাঁরা পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এই সভায় সংগ্রাম পরিষদের সকল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন যাদের মধ্যে তফিজ উদ্দিন আহমেদ, শাহ এন্তাজ উদ্দিন আহমে,দ জলিলার রহমান, আহসানুল হক ইদু, দেস্তার উদ্দিন খাঁ, আজিজার রহমান প্রেসিডেন্ট, মনির উদ্দিন আহমেদ এবং ডা: এজাহার উদ্দিনের নাম উল্লেখ্য।
সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ প্রথমেই ভাবলেন যেভাবেই হোক পাটগ্রামকে মুক্ত রাখতে হবে। ইতোমধ্যে অবাঙালী ইপিআরদের হত্যা করে বাঙালী ইপিআর সদস্যরা যুদ্ধের জন্য তৈরী। তাই ৪/৫ দিনের মধ্যেই বোরহান সুবেদারের নেতৃত্বে ইপিআর, পুলিশ, আনসার আর মুজাহিদদের নিয়ে একটি সম্মিলিত বাহিনী গঠন করা হয়। এদিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ পালিয়ে গিয়ে কুড়িগ্রামে আশ্রয় নেন এবং অন্যান্য ইপিআর সদস্যদের নিয়ে তিস্তা ব্রিজে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাটগ্রামের সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ এই সম্মিলিত বাহিনীকে ট্রেনে তুলে পাক বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকানোর জন্য বিদায় দেন। এই বাহিনী প্রথমে আদিতমারীর মহিষখোচায় তিস্তা নদীর ওপর পাড়ের পাক বাহিনীর সাথে গুলি বিনিময় করে এবং পরে তিস্তা ব্রিজে গিয়ে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশের সাথে যোগ দেয়। এদিকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বুড়িমারী থেকে বড়খাতা পর্যন্ত রেল লাইন উত্তোলন করে ফেলে। এসব পদক্ষেপের ফলে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধার কিছু অংশ যুদ্ধের শুরু থেকেই মুক্ত থেকে যায়।
এরপর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সামনে নতুন বাংলাদেশ পরিচালনা করার চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এ পাঠানো, অভ্যন্তরিন আইন শৃংখলা রক্ষা করা, সরকার পরিচালনার জন্য খাজনা সংগ্রহ করা ইত্যাদি অসংখ্য কাজ। কিছুদিনের মধ্যে প্রবাসী সরকারের কাঠামো তৈরী হয়ে যায় এবং ভারতের কুচবিহারে জোনাল এ্যাডমিনিস্ট্রেটরের অফিস বসানো হয়। পাটগ্রামেও তখন সাব জোনাল এ্যাডমিনিস্ট্রেটরের অফিস করা হয়। আর পাটগ্রামের চারিদিকের বর্ডারে কাস্টমস এর অফিস বসানো হয়। মুক্ত এলাকা নিশ্চিত হওয়ায় ৬ নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টারের অফিস বুড়িমারী হাশর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়। বাউরায় সাব সেক্টরের অফিস করে এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ডিফেন্স ক্যাম্প বসানো হয়। সরকারের অন্যান্য বিভাগ গুলো যেমন আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, বিচার ব্যবস্থাপনা, ডাকঘর এবং টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়। কায়েতুল্ল্যাহ ওসির নেতৃত্বে ২০০ মুক্তি পুলিশ গঠিত হয়, ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউদ্দিন আর নুরল উকিল মিলে বিচার ব্যবস্থা চালু এবং পোস্টমাস্টার ফায়জুল বারীকে দিয়ে পোস্ট অফিসও চালু করা হয়। এভাবেই তখন মুক্তাঞ্চল পাটগ্রামে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৬ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশার তখন বুড়িমারীতেই থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি তিনি একটি মেডিকেল ইউনিটও গঠন করেন। যার দায়িত্বে ছিলেন পাটগ্রামের প্রথম এম বি বি এস পাশ করা ডাক্তার “এজাহার উদ্দিন আহমেদ”। ১৯৬৬ সালে তিনি চিটাগাং মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করে এলাকার মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্য সরকারি চাকুরি না করে পাটগ্রামে ফিরে আসেন। সেসময় থানা শহন গুলোতে সরকারি হাসপাতালে একজন করে এলএমএফ ডাক্তার থাকতেন। তিনিই গোটা থানার মানুষের চিকিৎসা একাই করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাই এজাহার ডাক্তারের মতো এমবিবিএস ডাক্তারের অংশগ্রহণ ৬ নম্বর সেক্টরের মেডিকেল টিমকে শক্তিশালী করেছিল।
পাশ করে এসে পাটগ্রামে বর্তমানে যেখানে জনতা ব্যাংক সেখানেই “লাকী মেডিকেল হলে” তিনি প্র্যাক্টিস করতেন। বাঙালী জাতিয়তাবাদী চেতনায় উদবুদ্ধ ছিলেন তিনি। তাই পাটগ্রামে ফিরে তিনি আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। পাটগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য সকল কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এবং এরই ধারাবাহিকতায় ৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার কাজ বেছে নেন তিনি। পাটগ্রামে তখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পুরোদমে কার্যকর ছিল। কাস্টমস অফিসাররা খাজনা আদায় করছেন এবং নিয়মিত সাব-জোনাল অফিসে অথবা কুচবিহারে জোনাল এ্যাডমিনিস্ট্রেটরের অফিসে গিয়ে টাকা জমা দিচ্ছেন। তারপর সেখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তি পুলিশ সহ অন্যান্য কর্মচারিদের নিয়মিত বেতন দেয়া হতো। ডাক্তার হিসেবে এজাহার উদ্দিনও তখন মাসে ৩০০ টাকা বেতন পেতেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ই তিনি বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিড়রয় চিকিৎসা সেবা দিতেন। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ বিদেশী সাংবাদিক এবং বৃটিশ এমপিদের নিয়ে যখন পাটগ্রাম সফরে আসেন তখন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় এজাহার ডাক্তারের চিকিৎসা কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যান্য প্রতিভাবান মানুষের মতোই ডা: এজাহার একটু জেদী এবং একরোখা ছিলেন। ১৯৭৩ সালে এমপি নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলে তিনি পাটগ্রাম ত্যাগ করেন। এবং রেলওয়ের ডাক্তার হিসেবে লালমনিরহাটে জয়েন করেন। পাটগ্রামের মানুষ তাঁর প্রতিভার সদ্বব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন পাটগ্রামে থেকে ডাক্তারির পাশাপাশি পাটগ্রামের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল নানারকম বৈরিতা, ষড়যন্ত্র করে তাঁকে পাটগ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে। অভিমানী এজাহার ডাক্তার আর কখনই সেইভাবে পাটগ্রামে ফিরে আসেননি, যেভাবে তিনি আসতে চেয়েছিলেন। ১৯৯৫সালে তিনি রেলওয়ের বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। এবং ২০০৩ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই মহান সৈনিক ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। পরে তাঁকে রংপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।  লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সায়েদুল ইসলাম মিঠু।
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর