রংপুর মেডিকেলে মিলছে না চিকিৎসা ॥ দুই সপ্তাহে দেড় শতাধিক মৃত্যু
রংপুর অফিস: করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে রংপুরের বে-সরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বেশির ভাগই এখনো বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই এ অঞ্চলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের একমাত্র ভরসা হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা সেখানেও মিলছে না। গত প্রায় দুই সপ্তাহে এ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক রোগীর।
সম্প্রতি ব্রেইনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন নগরীর খাসবাগ এলাকার এক রোগী। ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা না পেয়ে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে এনে প্রাইভেট ডাক্তার দেখানোর উদ্যোগ নেন স্বজনরা। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, নগরীতে কোনো নিউরো সার্জন গত তিন মাস ধরে তাঁদের চেম্বারে বসছেন না। নিরুপায় স্বজনরা রোগীকে নিয়ে বাড়িতেই চরম উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন এখনো। ব্রেইনস্ট্রোকসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন নগরীর বুড়িরহাট এলাকার মাহবুবার রহমান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নগরীর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিউরো সার্জন ডা. সুকুমার মজুমদারের চিকিৎসায় ভালো ছিলেন। কিন্তু তিন মাসের বেশি সময় ধরে ওই চিকিৎসকের চেম্বার বন্ধ থাকায় পরামর্শ নিতে পারছেন না। বর্তমানে করোনাকালে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা না মেলায় হতাশায় ভুগছেন তাঁর মতো অসংখ্য রোগী।
কামলাকাছনা এলাকার এসকেন্দার মিয়া ডায়াবেটিসসহ কয়েকটি জটিল রোগ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে একপর্যায়ে বাসায় চলে যান। এর দুদিন পর তাঁরও ব্রেইনস্ট্রোক হয়। বাধ্য হয়ে পুনরায় হাসপাতালে আনা হয় তাঁকে। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার সকালে তিনি মারা যান।
সরেজমিনে গত কাল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ১০০০ শয্যার এই হাসপাতালে আগে যেখানে গড়ে ২০০০ এর অধিক রোগী অবস্থান করতেন, এখন সেখানকার প্রায় ওয়ার্ডগুলোই ফাঁকা পড়ে আছে। ভর্তি থাকা রোগীদের অনেকেই জানান, চিকিৎসক-নার্সরা ঠিকমতো তাঁদের কাছেই আসেন না। দিনে একবার এসে হয়তো দূর থেকে প্রেসক্রিপশনে শুধু ওষুধ বদলে দিয়ে চলে যান। এ ছাড়া করোনা সংক্রমণের ভয়ে একান্ত দায়ে না পড়লে রোগীরাও হাসপাতালে আসতে চান না বলে জানান তাঁরা। শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ছয় মাস বয়সী শিশুর মা তাহেরা বেগম বলেন, ‘ছাওয়ার (সন্তান) অসুখ বাবা, সেইবাদে দায়ে পড়ি আছি। দাক্তার (ডাক্তার) আইসে না, এ্যাটে এ্যালা আগের মতন চিকিৎসা নাই।’
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, গত প্রায় দুই সপ্তাহে স্ট্রোক, হার্টের সমস্যা ও কিডনিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দেড় শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। লাশ হস্তান্তরের দায়িত্বে থাকা সর্দার (হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) আব্দুর রশিদ জানান, আগে প্রতিদিন হাসপাতালে পাঁচ থেকে ছয়জন রোগীর মৃত্যু হতো। এখন গড়ে সেখানে ১০জনের বেশি রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
জানতে চাইলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি ঠিক নয়। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। তবে মৃত্যুর হার কিছুটা বেড়েছে।
এ ব্যাপারে রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. হিরম্ব কুমার রায় জানান, ‘চিকিৎসাসেবা দিতে রংপুরের বে-সরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানা প্রতিষ্ঠাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতীয় বার্তা- এর অন্যান্য খবর