রংপুর অঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, ব্রক্ষ্মপুত্র, সানিয়াজান ও দুধকুমার নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে
রংপুর অফিস: অবিরাম বর্ষন এবং ভারত সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পানির ঢলে রংপুর অঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, ব্রক্ষ্মপুত্র, সানিয়াজান এবং দুধকুমার নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে এসব নদী তীরবর্তি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে । পানিবন্দী হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ। সেই সাথে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে নদী ভাঙ্গন। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে অসহায় মানুষ বাড়ি ঘর ছেড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে।
 গতকাল মঙ্গলবার ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে রংপুর অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা, ধরলা, ব্রক্ষ্মপুত্র, সানিয়াজান ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অতি বর্ষণ এবং তিস্তার ঢলে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বন্যায় রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির আমন বীজতলা, আউষ, শাকসবজি, চীনাবাদাম ও তিল ফসল পানির নীচে তলিয়ে গেছে। ফলে এসব এলাকার কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তিস্তার পানি গতকাল সকালে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার, ধরলার পানি কুড়িগ্রম ব্রিজ পয়েন্টে ৭৩ সেন্টিমিটার ও ব্রক্ষ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৭৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাঁধ রক্ষায়  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এদিকে, তিস্তার পানি নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডালিয়া পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুাইস গেট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তিস্তা ব্যারাজের গেজ রিডার নুরুল ইসলাম জানান, ভারত থেকে নেমে আসা পানির  ঢল ও অনবরত বৃষ্টির ফলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পানি শাখা) এ এস এম আমিনুর রশিদ জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ব্যারাজের সব গেট খুলে রাখায় ভাটি এলাকার খালিশা চাঁপনী ও বাইশপুকুর চর প্লাবিত হয়ে বাড়িঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে পানি বৃদ্ধির কারণে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা নদীর বাম তীর রক্ষায় নির্মিত টি-বাঁধটি ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বাঁধটি রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ডা¤িপং করছেন। ফলে যেকোনো মুহূর্তে বাঁধটি নদী গর্ভে বিলিন হয়েন গেলে পার্শ্ববর্তী গ্রামের শত-শত বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে। উত্তরাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ জানান, ভারতে ভয়াবহ বন্যা হওয়ায় এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তিনি আরো জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, ব্রক্ষ্মপুত্র ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ভাঙ্গনে ১৫৩ টি বসতবাড়ি নতুনকরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
 রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় রোপাআমনের ৪ হাজার ৫৩১ হেক্টর আমনের বীজতলাসহ অন্যান্য উঠতি ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী ও জলাবদ্ধতা হলে এসব ফসল কৃষকরা ঘরে তুলতে পারবেন না। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, যেসব ফসলের ক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে সেসবের তালিকা করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে।
বন্যাদুর্গত এলকার জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে রংপুর বিভাগে ৭০৯টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম বন্যায় দুর্গত প্রতিটি এলাকায় অবস্থান করে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ নানা ধরনের ওষুধ সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাক্তার আমিন আহমেদ খান জানান, রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বন্যা দেখায় বন্যা কবলিত মানুষদের বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ডায়রিয়া বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় অসুস্থ না পড়ার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য টিম গঠন করে দ্রুত বন্যা দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কে এম তারিকুল ইসলাম জানান, রংপুর অঞ্চলের ৫ টি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিমুঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যা কবলিত ৫টি জেলায় ১৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা এবং ৭ শ ৪৫ মেট্রিকটন খয়রাতি চাল বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। বিভাগীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলার ১০৩ টি ইউনিয়নের ৮৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।         
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর