জীবন রক্ষায় প্রকৃতির মেরামতের সহায়ক কর্ম শুরু করি
মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার : আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বের রীতি নীতি হলো ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে। তাঁর জন্য ব্যবহার করতে হবে বাণিজ্যিক উপকরণ ভ্যাক্সিন অথবা নানা ঔষধ। করোনার মত অদৃশ্যমান ছোয়াচে স্পর্শকাতর ভাইরাসের সাথে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রদেয় লক ডাউনের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা কতটুকু  প্রাসঙ্গিক বিষয়টি আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে অবশ্যই ভেবে দেখার সময় হয়ে গেছে। এ অনাকাঙ্খিত খেলায় আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়ার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি কিনা ভেবে দেখতে হবে দেশের মানুষকে।
পৃথিবীতে বৈশ্বিক মহামারী দূর্যোগ অনাদিকাল থেকে ছিল,এখনও আছে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নানা ভাইরাসের থেকে মুক্তি পাবার জন্য ভ্যাক্সিন ও ঔষধ আবিস্কার হলেও আমরা মানব জাতি কিন্তু ভাইরাস মুক্ত হতে পারিনি, পারছিনা। প্রতি বছরই নিত্য নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। মারাও যাচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে এটি চিরাচরিত রীতি ও প্রথাসিদ্ধ বিষয় হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।
আমরা মনে করি- জ্ঞানী গুনি ও বিজ্ঞানীদের ভাবনার বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল কেন এবং কি কারনে দিন দিন পৃথিবী জুড়ে এমনতর খারাপ ভাইরাসের উৎপত্তি হচ্ছে?
আমরা বিশ্বাস করি-পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিল্পের যতটা বিকাশ ঘটছে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য ততটাই বিনষ্ট হচ্ছে। এ কারনে সময়ের প্রেক্ষাপটে জন্ম হচ্ছে মানব জীবন হানিকর নানা ভাইরাস। শিল্প বৈর্জ্য,মানব সৃষ্ট বৈর্জ্য,চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত বৈর্জ্য, রাসায়নিক বৈর্জ্য,যান্ত্রীক গাড়ী, প্লেন,জাহাজ,স্টীমার পরিত্যাক্ত গ্যাস,তেল, সর্বোপরি কৃষিতে ব্যবহৃত নানা রাসায়নিক সার ও কীট নাশক ব্যবহার আমাদের প্রকৃতি পরিবেশকে নষ্ট করে, মানুষের বাসবাসের এবং জীবন ধারনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ করে করে তুলেছে।
আমরা আরো বিশ্বাস করি-এর ফলে অঞ্চল ও দেশ ভেদে প্রতিটি দেশের মাটি ও প্রকৃতি এ পরিবেশের নিজস্ব স্বত্বা ও গুনাগুন বিনষ্ট করে পরনির্ভরশীলতার মাঝে সেই দেশের জনগোষ্ঠিকে কোন রকমে বাঁচিয়ে রাখা ও টিকিয়ে রাখার অপকৌশলের অপর নাম বৈশ্বিক বাণিজ্যিক উন্নয়ন। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়। সে কারনে দেশের মূল সম্পদ মানুষ,জীব উদ্ভীদ জগত, প্রাণিজগত ( জীব অনুজীব) মাটি,পানি ও কৃষি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণটাই বাণিজ্য নির্ভর করা হয়েছে। রাষ্ট্রের মাঝে মানুষের যে ৫ টি মৌলিক অধিকার-অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এগুলোর সবই এখন বাণিজ্য নির্ভর। অর্থাৎ আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা স্বাস্থ্য সবকিছুই নির্ধারিত হয় পুঁজির বাণিজ্যিক ধারায় লাভ ও লোকশানের ওপর ভিত্তি করে। সেবা পাওয়াটাও নির্ভর করে আর্থিক যোগ্যতার মানদন্ডের ওপর। আধুনিক বিশ্বে কৃষক ও শ্রমজীবি মানুষ এখন পণ্যের মত। অনেকটা শিল্প বাণিজ্যের মালিকের অধীনের দাস। দাসের আবার আবার নাগরীক অধিকার,স্বাস্থ্য,শিক্ষা সেবা নিশ্চিত করতে হবে এ আবার কেমন উদভট কথা? যতো কম মূল্যে দাসের মেধা ও শ্রমকে ক্রয় করা যাবে তত বেশী বাণিজ্যে লাভবান হওয়া যাবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে  সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি এখন শিল্প বাণিজ্যের মালিকগণ। সোজা ও সরল ভাষায় বলা যায়, আমাদের রাজনীতি,অর্থনীতি,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,সংস্কৃতি চিরাচরিত নিজস্ব জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ধারার ওপর নির্ভরশীল নয়। বৈশ্বিক মহামারী,কিম্বা ভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রেও আমরা বিশ্বসংস্থার প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভরশীল। কারন জনগণের সেবার নামে সেই সকল আন্তর্জাতিক বিশ্ব সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এসে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের শাসক ও রাজা সেঁজে ভোগবিলাসী জীবন যাপন করতে হয়। আবার সেখান থেকে কিছু সরিয়ে পাঁচার করে ভিনদেশের ব্যাংকে জমা রেখে নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা বিধান করতে হয়। আমরা এখন নানা সঙ্কটের মাঝে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণান্তকর সংগ্রাম করছি।
জাতির টিকে থাকার উপায় হিসেবে আমরা মনে করি- প্রকৃতি ও পরিবেশের মাঝে সৃষ্ট নানা ক্ষত মেরামত করে,দেশের কৃষি ব্যবস্থাপণাকে রাসাযনিক সার কীটনাশক মুক্ত পূনরগঠণ করে,তৃণমূল পর্যায়ে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে,লক্ষ লক্ষ বেকারের কর্ম সংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করে,কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করনের মাঝে দিয়ে, দেশব্যাপী সাম্যের অর্থনীতির প্রবাহ ব্যবস্থা চালু করে,আমরা জাতি গঠন ও রক্ষার লক্ষ্যে ঘুড়ে দাঁড়াতে পারি। বাংলাদেশের গণমানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার মূল ঘোষণা পত্রে- সাম্য,মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে স্বশস্ত্র লড়াই ও আত্মবিলদানের মাধ্যমেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। রাজনীতির কর্ণধাররা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহকরা সে শর্তগুলো ভুলে গেলেও আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু ভুলে যাইনি।
প্রকৃতি পরিবেশকে রক্ষা করেই নিজস্ব জ্ঞান,বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদের মত করে আমাদেরকে রক্ষা পেতে হবে। কারো প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। অন্যের দেয়া প্রেসক্রিপশন কিম্বা পরামর্শে আমরা জাতি হিসেবে টিকে থাকতেও পারবোনা বলে আমরা মনে করি। পরিশেষে মূল প্রাসঙ্গিক বিষয়ে এটাই বলা যায় যে, প্রকৃতির মাঝে বিরাজমান হাজার হাজার জীব অনুজীব ভাইরাসের সাথে একে অপরের পরিপূরক হয়েই মানব জাতি হিসেবে আমরা পৃথিবীতে টিকে আছি। এ ধারা অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। সব ভাইরাসকে ধ্বংস করে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুুদ্ধ করে পৃথিবীতে টিকে থাকা যাবেনা। সব ভাইরাস জীব অনুজীব মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক নয় কিছু কিছু ভাইরাস মানব দেহ রক্ষায় সহায়কও বটে।
প্রকৃতির ও পরিবেশের ওপর মানুষের বৈরী আঁচরণের মাঝ দিয়েই খারাপ ও ক্ষতিকর ভাইরাসের জন্ম হয়। আসুন আমরা প্রকৃতি পরিবেশের মেরামতের সহায়ক কর্মের সূচনা করি। প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষায় আত্ম নিয়োগ করি। প্রকৃতি পরিবেশের মাঝে দৃশ্যমান অদৃশ্যমান জীব অনুজীব ভাইরাসের সাথে সহনশীল বসবাসই কেবলমাত্র মানব জাতিকে রক্ষা করতে পারে। এ ধারার ব্যত্যয় ঘটলে কালে কালে যুগে যুগে নানা সঙ্কটে মানব জাতিকে হয়তো এ পৃথিবীর বিলুপ্ত প্রাণির তালিকাতেই নাম লেখাতে হবে।
লেখকঃ প্রধান সম্পাদক, শাহজাদপুর সংবাদ ডটকম ও সিনিয়র সহ-সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা একাত্তর কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা।
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর