দেশ করোনামুক্ত হলে দেখা হবে স্ত্রী সন্তনের সাথে -রংপুর আইসোলেশনের তত্ত্বাবধায়ক
গোলাম মোস্তফা আনছারী, রংপুর অফিস : প্রাণঘাতী কোভিট ১৯ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সামনের সারিতে থেকে লড়াই করে চলেছেন চিকিৎসকরা। দেশের প্রথম করোনাযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুবরণও করেছেন চিকিৎসকদের একজন। পরিবার-পরিজনের মায়া দূরে ঠেলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে করোনা রোগীদের সেবায় চিকিৎসকদের এই ত্যাগ মানবতার উজ্জ্বল মানবতার দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে চলা এই করোনাযুদ্ধের শেষ কোথায় তা জানে না কেউ। কবে আবার সব আগের মতো স্বাভাবিক হবে পৃথিবি। জমবে মিলনমেলা সেই অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে গোটা মুসলিম জাতীর কেটে গেল রোজাও ঈদুল ফিতর। বিশেষ করে এবারের রোজা এবং ঈদের দিনটা অন্যরকম চিকিৎসকদের কাছে।তাদের কাছে যেন খুবই অপরিচিত এক ঈদ। স্বজনদের দূরে রেখেই ঈদের দিনটি কেটেছে অনেক চিকিৎসকের। ঠিক এমনই এক করোনাযোদ্ধা রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার এস এম নূরুন নবী। আপন স্বজনদের দূরে রেখেই এবার কেটেছে তার ঈদ। করোনা রোগীদের সেবার দায়িত্ব নিতে স্বেচ্ছায় আবেদন করেছিলেন নূরুন নবী। করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভুলে গেছেন তিনিও একজন বাবা, কারও স্বামী সহ পরিবার পরিজনের কথা। দিনের অধিকাংশ সময় হাসপাতালে কাটছে তার। বাড়িতে গেলেও বজায় রাখতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। মন চাইলেও কাছে টেনে আদর করতে পারছেন না ছেলে-মেয়েকে। করোনার ভয়ে ঈদের দিনও ছেলে-মেয়েকে কোলে নেননি এই চিকিৎসক বাবা। প্রতিবেশীরা যখন বাড়িতে সন্তানসহ পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে ঠিক তখনও সন্তানদের কাছে যাননি চিকিৎসক নূরুন নবী। বুকে পাথর বেঁধে স্ত্রী-সন্তানদের দূরে রেখেছেন তিনি। বললেন, দেশ করোনামুক্ত হলে আবার দেখা হবে সবার সাথে। তিনি আরো বলেন, আমার বাবা একজন আদর্শ শিক্ষকও মুক্তিযোদ্ধা বাবার আদর্শেই আমার  এই অনুপ্রেরনা।
ডাক্তার এসএম নূরুন নবী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট। বর্তমানে রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বপালন করছেন। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ১৯ এপ্রিল থেকে এই হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে ১৮ মার্চ করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে স্বেচ্ছায় আবেদন করেন তিনি।এসএম নূরুন নবী বলেন, শুরুতে ছয়জন চিকিৎসক ও ছয়জন নার্স নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে আরও ২২ জন নতুন চিকিৎসক এখানে যোগ দেন। হাসপাতালের বাইরে করোনা আক্রান্ত রোগীদের টেলিমেডিসিন সেবা দেয়া হয়। নতুন চিকিৎসকরা কাজের পাশাপাশি টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছেন। রোববার (২৪ মে) পযর্ন্ত এ হাসপাতাল থেকে ৫২ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
করোনা রোগীর চিকিৎসা দেয়া চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ডাক্তার এসএম নূরুন নবী সাংবাদিকদের বলেন, পঞ্চগড়ের এক নারী করোনাভাইরাস ছাড়াও গাইনি জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে তিন ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন ছিল। বদরগঞ্জের বৃদ্ধকে (৮০) চিকিৎসা দেয়া চ্যালেঞ্জ ছিল। সৃষ্টিকর্তার রহমতে এবং চিকিৎসকদের চেষ্টায় তারা দুজনসহ ৫২ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।করোনা রোগীদের মনোবল বাড়াতে নিজ উদ্যোগে হাসপাতালে ভর্তি এবং বিদায়ের সময় চিঠি ও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। রংপুর ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে এমনই ব্যতিক্রম এক উদ্যোগ নিয়েছেন ডাক্তার নূরুন নবী। করোনা শনাক্ত হলে কোনো রোগী যেন হাসপাতালে এসে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন সেজন্য এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জানা যায়, ব্যক্তিগত জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ডা. এসএম নূরুন নবী। স্ত্রী রাশেদা খানম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ছেলে এসএম গাজী রশিদুন্নবী রংপুর জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। মেয়ে নাদিয়া জাহান রায়নার বয়স ছয় বছর।করোনা হাসপাতালের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তাকে হাসপাতালেই কাটাতে হচ্ছে অধিকাংশ সময়। মাঝে মধ্যে বাড়িতে গেলেও সামাজিক দূরত্ব মানতে হচ্ছে তাকে। এ কারণে ১৯ এপ্রিল থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে দূরে থাকছেন। চাইলেও কাছে টেনে আদর করতে পারছেন না তাদের। করোনার ভয়ে ঈদের দিনটিও এভাবে কেটেছে তার।জানতে চাইলে ডাক্তার এসএম নূরুন নবী বলেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকার ব্রত নিয়ে কাজে যোগ দিয়েছি। জাতির এই দুর্যোগে পরিবারের চেয়ে আমার কাছে মানুষের সেবা মুখ্য। তাই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেছি। ডাক্তার এসএম নূরুন নবীর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলায়। ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৯২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন নূরুন নবী। এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশুবিষয়ক প্রকল্পে চাকরি করেন তিনি।২০১৬ সালে শিশুরোগ বিষয়ে এফসিপিস ও এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিরত অবস্থায় ২০১৭ সালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং ২০২০ সালের ৩ মার্চ সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। ৩১ মার্চ ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগ দেন।
কোভিট ১৯ এর আঁধার কেটে গেলে আবার একদিন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে উঠবে । এই প্রত্যাশায় স্বামীর অপেক্ষায় বসে আছেন স্ত্রী রাশেদা খানম ও তার সন্তানরা।রাশেদা খানম  সাংবাদিকদের বলেন, এমন একজন চিকিৎসকের স্ত্রী হয়ে আমি গর্বিত। যে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা না করে করোনা রোগীদের সেবায় স্বেচ্ছায় হাসপাতালের দায়িত্ব নিয়েছেন। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকসহ রোগীদের জন্য দোয়া করছি আমরা।
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর