৬৯ সালের বঙ্গবন্ধু’র স্মৃতি গাঁথা লালমনিরহাটে পাটের গোডাউন
নিজস্ব সংবাদদাতা:
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ৬৯ সালে লালমনিরহাটের সাপটানা প্রয়াত আলহাজ্ব মোঃ আবুল হোসেন এমপির গদি ঘরে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আসার খবর মূহুর্তে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঘরোয়া মিটিংয় মূহুর্তে জনসমুদ্র পরিণত হয়। উপস্থিত সমবেত জনতা বঙ্গবন্ধুর কে একনজর দেখতে ও তার বক্তব্য শুনতে মরিয়া হয়ে উঠে। জনতার চাপে মোঃ আবুল হোসেনের পাটের গোডাউন চত্বরের গদিঘরের বেড়া ভেঙ্গে ফেলা হয়। সাধারণ মানুষের ভীড় দেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলে উঠেন আবুল বেড়া ভেঙ্গে দেয়। ঘরোয়া বৈঠক মূহুর্তে জনসমুদ্রে পরিণিত হয়। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত শেষ গোডাউন ঘরটি আজো আছে। নেই শুধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজবুর রহমান। মুজিব শতমতজন্মবার্ষিকীতে তাই সেই সময়ে ছাত্র নেতা,মুক্তিযোদ্ধা, কিশোর ও আওয়ামীলীগ কর্মীদের মনে এখনো সেই দিনের স্মুতি ভেসে উঠে। তারা আবেদপ্রবণ হয়ে পড়েনে।
সেই সময়ে ছাত্র নেতা, বর্তমানের রেলশ্রমিক লীগলীগ নেতা ও অবসর প্রাপ্ত রেলওয়ে কর্মী মোঃ শফিয়ার রহমান(৭০) জানান, তখন আমি কলেজে পড়ি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবাবুল ভাইয়ের গতি ঘরে এসেছে শুনে। সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি গদিঘরের সামনের রাস্তায় শতশত বিভিন্ন বয়সের মানুষ ভীর জমিয়েছে। সকলে আবুল ভাইয়েল পাটের গোউউনের চত্বরে ঢুকতে চায়। সকলে একটাই উদ্দেশ বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখবে। তার বক্তব্য শুনবে। তখন দেশে সামরিক শাসন চলছিল। তাই উম্মুক্ত স্থানে সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং নিষিদ্ধ ছিল। তাই বঙ্গবন্ধু লালমনিরহাটের স্থানীয় নেতা কর্মীতের সাথে বৈঠক করতে সাপটানা আবুল ভাইয়ের গদি ঘরে আসেন। সেই সময় আজকের মত যোগাযোগ ব্যবস্থার এতো উন্নত ছিলনা। লালমনিরহাট শহর ছিল গ্রাম্য পরিবেশ। তবুও এ খবর কিভাবে যেন মূহুর্তে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ পানির স্রোতেরমত সাপটানর দিকে ছুটছে। মূহুর্তে সাপটানার আবুল ভাইয়ের পাটের গোডাউন চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেদিনের কথা মনে হলে আজও শরীরে একধরণের উম্মাদনা সৃষ্টি হয়।
মুক্তিযোদ্ধা মেজবা হোসেন(৭০) জানান, তখন তরুন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। বঙ্গবন্ধু লালমনিরহাট শহরের সাপটানা বাজারে সেই সময় কুড়িগ্রাম মহকুমা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবুল হোসেন ভাইয়ের গদি ঘরে আসেন। সেখানে নেতা কর্মীদের এক বৈঠক ছিল। কিন্তু সেই বৈঠক জনসমুদ্রে পরিণিত হয়। বঙ্গবন্ধু আবুল ভাইকে নির্দেশ দেন। গোডাউনের বেড়া খুলে দিতে। সেদিন বঙ্গবন্ধু নেতা কর্মীদের দিক নির্দেশনা দেন। তখন হতে আমরা তরুণরা লালমনিরহাটে সুসংগঠিত হতে থাকি। পরে তার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। সেই সময় তার বক্তব্য মনোমূগ্ধ হয়ে শুনি। কি সেই তেজিময় বক্তব্য। সেই সময় দেশে সামরিক শাসন চলছিল। কিন্তু মানুষ সামরিক শাসন না মেনে সাপটান ছুটে এসেছিল।
আলহাজ্ব মোঃ আবুল হোসেন এমপির ছেলে বর্তমান পিএসসির সদস্য প্রফেসর মোঃ হামিদুল হক মন্টু জানান, ৬৯ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার বাবার পাটের গোডাউন ও গদি ঘরে এসেছিলেন। তখন আমি ৫ম শ্রেনিক ছাত্র ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সেখানে কর্মীদের নিয়ে বৈঠক করার কথা ছিল। কিন্তু বৈঠকটি মুহুর্তে জনসমুদ্রে পরিণিত হয়। শতশত শানুষ ভীর জমায় এক পর্যায়ে মানুষের ভীর সামাল দিতে বঙ্গবন্ধু বলে উঠেন, আবুল বেড়া ভেঙ্গে দেয়। তখন বঙ্গবন্ধু আমার বাবার পাটের গোডাউনের ভিতরে চত্বরের সামনে জলচকিতে বসে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পায়ে কাছে আমি বসে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে আদর করেছে। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর স্নেহ পেয়েছেন। তখন বাবার বয়স ছিল ৩৫ বছর। সেই ৩৫ বছর বয়সে বাবা বঙ্গবন্ধুর আর্শীবাদ পেয়ে ১৯৭০ সালে ( আলহাজ্ব  মোঃ আবুল হোসেন এমপি) পাকিস্তান পার্লামেন্টের সদস্য (এমপিএ)  নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংঘটক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম মহকুমার সরকারি কোষাগার মুক্তিযোদ্ধারা লুট  করে। সেই লুটের অর্থ ও স্বর্ণ ভারতের স্বাধীন বাংলাদেশর সরকারের তহবিলে জমা দেন। সেই সময় তার এই বীরত্বপূর্ন অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাকে থ্যাংস্ক লেটার দেয়। যাহা সংরক্ষিত আছে। প্রফেসার মন্টু আরো জানান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই দিন জনতার উদ্যোশে আবেগময় বক্তব্য দেন। সামরিক শাসন থাকায় সেই সময় মিছিল, মিটিং, সভা ও জনসভা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আগমনের খবরে সেই নিষেধাজ্ঞা কেউ মানেনি। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ ও আর্শিবাদ পেয়ে বাবা ১৯৭০ এমপিএ, ১৯৭২ সালে এমসিএ(বাংলাদেশের সংবিধান প্রনয়ন কমিটির সদস্য), ১৯৭৩ সালে এমপি ও ১৯৮৬ সালে এমপি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত সেই গদি ঘর এখনো আছে। শুধু নেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। সেই ৬৯ সালে স্মৃতি এখনো ভেসে উঠে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শততমজন্মবার্ষিকীতে এসে এখনো সেই দিনের কথা বেশি বেশি করে মনে পড়ে।  লালমনিরহাটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসার দিনটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে। সেই সময়ের নেতা, কর্মী, ছাত্র ও মুক্তিযোদ্ধাগণ আজো ভুলতে পারেনি। এখনো সেই দিনের বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য তাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। প্রফেসার মন্টু বলেন, বঙ্গবন্ধু বাবার গদি ঘরে এসে বক্তব্য দেয়ায় বাবাকে তখন পুলিশ গ্রেফতার করে। পাটের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। পাটের ব্যবসাসহ সকল লাইন্সেস বাতিল করে। পরে অবশ্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় থানায় হাজিরা দেয়ার শর্তে জামিনে মুক্তি যায়।
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর