স্যার ফজলে হাসান আবেদ স্মরণে
বার্তা মনিটর: ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার বানিয়াচং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। ফজলে হাসান আবেদ তৃতীয় থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর কুমিল্লা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পাবনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন নবম শ্রেণিতে। সেখান থেকেই ১৯৫২ সালে তিনি ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যান ইংল্যান্ড।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ ১৯৬২ সালে লন্ডনে অ্যাকাউন্টেন্সি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং অ্যাকাউন্টেন্ট হন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানির চট্টগ্রাম অফিসে সিনিয়র কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নাটকীয়ভাবে তাঁর জীবনের দিক পরিবর্তন করে দেয়। চাকরি ছেড়ে তিনি লন্ডনে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য অ্যাকশন বাংলাদেশ ও হেলপ বাংলাদেশ নামে দুটো সংগঠন গড়ে তোলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে তিনি যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ভারত থেকে ফিরে আসা এক কোটি শরণার্থীর জন্য জরুরিভাবে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন ছিল। আবেদ ভাই তখন প্রত্যাগত শরণার্থীদের সহায়তায় দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা শাল্লায় ‘ব্র্যাক’ গড়ে তোলেন। দক্ষতা  উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটানো ছিল প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ ১৯৭২ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাকের চেয়ারপারসন  হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ১ আগস্ট তারিখে ব্র্যাক এর চেয়ারপারসন পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক এর চেয়ারম্যান এমিরেটাস পদে আসীন ছিলেন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্র্যাক ব্যাংকেরও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এবং ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল ও ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদের অনন্য নেতৃত্বে ব্র্যাক দেশে ও বিদেশে নানা পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
আবেদ ভাই প্রায়ই বলতেন, কেউ আমাকে যখন জিজ্ঞাসা করেন ব্র্যাক মানে কি, আমি তাদেরকে বলি, ব্র্যাক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, ব্র্যাক একটি স্বপ্ন, একটি প্রচেষ্টা। এটি এমন একটি পৃথিবীর প্রচেষ্টা,  যেখানে সকল মানুষ তার সম্ভাবনা বিকাশের সমান সুযোগ লাভ করবে।
ব্র্যাক সবসময় বিশ্বাস করে, ধনী আর দরিদ্রের বিভেদ তৈরি করে যে বৈষম্য, তা মানুষেরই সৃষ্টি। সহানুভূতি, সাহস আর অঙ্গীকারের মতো মানবিক গুণাবলী দিয়েই পৃথিবীতে পরির্তন আনা সম্ভব। মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করা, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলা  এবং তাদের নিজেদের সমর্থ্য সম্পর্কে সজাগ করার মন্ত্রগুলোই ব্র্যাকের সকল কাজের মধ্যে সমানভাবে মিশে আছে। চেয়ারপারসন পদ থেকে অবসরের সময় কর্মীদের কাছে লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে আমি বহুবার দেখেছি, যখন মানুষ নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পায়, তখনই হতাশা কাটিয়ে সে বিজয়ী হয়। আমি চাই, তোমরা প্রতিনিয়ত মানুষের মাঝে এই আত্মবিশ্বাস জাগয়ে তোলার জন্য কাজ করে যাবে’।
আবেদ ভাই ওই চিঠিতে ব্র্যাকের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলে গেছেন, তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী দশ বছরে আমরা আমাদের কাজের প্রভাব পৃথিবীর আরও বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৫০ মিলিয়ন মানুষের কাছে ব্র্যাক যেন পৌঁছে যায়, সেটিই আমার প্রত্যাশা। আমি স্বপ্ন দেখি, ব্র্যাক আগামীতে আরও বড় হবে, নতুন উদ্ভাবন চালিয়ে যাবে এবং নতুন দিনের প্রয়োজনে নতুন সমাধান নিয়ে এগিয়ে আসবে’।
ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ গত ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখ শুক্রবার রাত ৮.২৮ মিনিটে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর