৭১ ডাইরীর পাতা থেকে - এ কে এম সিরাজুল ইসলাম
বার্তা মনিটর: সুভাষ পল্লীর ট্রানজিট ক্যাম্পে আমার চাচাত ভাই নূরুল ইসলাম আর সাথে নেয়া এলাকার সংগী দশ জন ছাত্র সহ ক্যাম্পের অন্যান্যদের নিয়ে বসে সময় কাটাচ্ছি, কবে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ি আসবে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলাম, মনটা ছটফট করছিল। জানতে পারলাম,পূর্বের ন্যায় তাপুরহাট রিক্রুটিং ক্যাম্পে আমাদেরকে না নিয়ে সরাসরি আসল ট্রেনিং ক্যাম্প মুজিব ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। রংপুরের পেয়ারা ভাই আর মুজিবর ভাইয়ের তত্ত্বাবধনে শারীরিক কসরত আর গানবাজনা গল্পগুজবে সময় কাটছিল আমাদের। ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া একান্ত মানা। সমবয়সী ছোট চাচা আবদুস সাত্তার আমাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে আসার কয়েকদিন পূর্ব এখানে এসেছিলেন তা আমাদের জানা ছিল না। চাচা ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা, মিশুক এবং ভবঘুরে স্বভাবের লোক। অপরিচিত লোকদের সাথে কথা বলে অল্প সময়ের মাঝে তাদেরকে আপন করে নিতে পারতেন। ক্যাম্পের গেটের ডিউটিম্যানকে বলে ক্যাম্পের বাইরে চলে যেতেন চা-নাস্তা আর সিগারেট খেতে। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে চা-নাস্তা খেতে যেতেন। আশে পাশের স্থানীয় অনেকের সাথে অল্পদিনের মধ্যে তার একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। এমন কি তাদের অনেকের বাসায় আমাকে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করতেন। আমার ডাইরি লেখার অভ্যাস ছিল, তাই সময় পেলেই ডাইরি লিখতাম। ট্রানজিট ক্যাম্পেও আমার সাথে ডাইরিটা ছিল। চাচা বললেন, তোমাকে কেউ ডাইরি লিখা দেখলে পাকিস্তানের গুপ্তচর ভাববে। তোমাকে শেষ করে দিবে, তাই ডাইরিটা কারও কাছে রেখে মুজিব ক্যাম্পে ট্রেনিংএ যেতে হবে। ওনার কথামত ডাইরিটা ওনাকে দিলাম স্থানীয় কারও কাছে রেখে দেবার জন্য। উনি আমাকে নিয়ে ক্যাম্পের বাইরে একজনের কাছে ডাইরিটা দিয়ে বললেন এটা রেখে দিতে। ট্রেনিং  শেষে ফিরে এসে সময় মত তা নিয়ে নিবেন। ট্রানজিট ক্যাম্পের ৪র্থ দিনে সকাল বেলায় ভারতীয় আর্মির একটা গাড়ি  গেটের কাছে থামলো, আমাদেরকে তাড়াতাড়ি গোছগাছ করে খেয়ে ট্রাকে উঠতে বললো। আমরা যথারিতি ৩০/৪০ জনের একটা দল গাড়িতে উঠে গেলাম। গাড়ির ভিতরে দু'পাশে বসার সিট। কেউ কেউ সিটে বসল আবার কেউ মাঝখানে রড ধরে পথের দৃশ্য দেখতে দেখতে চলল। সুভাষপল্লী, কোচবিহার থেকে নিউকোচবিহার, আলিপুর দুয়ার, ফালাকাটা, ধুপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, বিন্নাগুড়ি হয়ে চালসা হয়ে গাড়ি ছুটে চলছে। আমরা সমতল ভুমি এলাকার বাসিন্দা। সে সময় পাহাড়-পর্বত দেখার সৌভাগ্য তেমন একটা হয়নি। পাথরে তৈরি মশৃণ সুন্দর পাকারাস্তা, রাস্তায় নেই তেমন কোন গাড়ির ভীড় বা জামজট, রাস্তার দু-ধারে শালবাগানসহ বিভিন্ন ধরনের বড় বড় গাছ।বনজঙ্গলের মাঝেমধ্যে বনবিভাগ আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর চৌকি। সে সময় নকশাল বাড়ি আন্দোলন চলছিল তাই পুলিশ /আর্মি তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝে মধ্যে গাড়ি চেক করছে। ফালাকাটা পার হবার সময় মনে পড়ে, ফালাকাটা পোস্ট অফিসের কাছেই সম্পূর্ণ শাল কাঠের তৈরি আমাদের এক আত্মীয়ের দোতলা বাড়ি। শালকাঠের সহজ লভ্যতায় এ এলাকায় কাঠের তৈরি অনেক অনেক বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। বনের মাঝ দিয়ে চলতে চলতে দেখা যায় কোথাও হাতি,বাঘ, শিয়াল রাস্তা পার হচ্ছে, বানর ও হনুমান গাছের ডালে লাফালাফি করছে। এভাবে বনজঙ্গল আর চা-বাগানের পাশ দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে। জলঢাকা আর মুর্তি নদী পাড়ি দিয়ে চালসা পৌছি।কোচবিহার থেকে চালসা পর্যন্ত সমতলভূমি। তারপর সমতলভূমি থেকে উপরের দিকে পাহাড়ি পথে গাড়ি চলছে। চালসা থেকে মূলত মেটলি থানার শুরু। দেখলাম, পাহাড়ের উপরে মেটলি রেল স্টেশনে একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে, একটু পরেই ধোয়া উড়িয়ে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ট্রেনটি মেটলি ছেড়ে চলে গেল। লোকজন হাঁটা পথে পাহাড়ি পথে চলছে, আবার কেউ কেউ বাই- সাইকেলে নিজ নিজ গন্তব্যে চলছে। পাহাড়ি রাস্তায় চলার পথে আমাদেরকে বহনকারী আর্মি গাড়ি বার বার হুইসেল দিয়ে সামনের ট্রাকচালকের কাছে সাইট চাচ্ছে কিন্তুু সামনের গাড়ি চালক কিছুতেই সাইট দিতে পারছে না, এক সময় সুযোগ বুঝে ট্রাকের সামনে আমাদের গাড়ি থামিয়ে ট্রাক থেকে নামিয়ে পাবলিক ট্রাকের ড্রাইভারকে বেশ চড় থাপ্পড় মারল। মনেপড়ল, শুধু পাকিস্তানী সেনারা বল প্রয়োগ করে না, ভারতের মত গণতান্ত্রিক দেশেও সেনাবাহিনীর লোকেরা বেশি করে প্রতাপ প্রতিপত্তি খাটায়। পাহাড়ি রাস্তায় চলার পথে স্থানীয়রা আমাদের দেখে 'জয়বাংলা' শ্লোগান দিত, আমরাও হাত নেড়ে তাদের অভিনন্দন জানাতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের বহনকারী সেনা ট্রাক এক সময় চলতে চলতে পাহাড়ের চুড়ায় সামসিং চা বাগানে এসে থামল। দেখলাম, এরিয়ার বাইরে ভুট্টা ক্ষেত। পাহাড়ের জমিতে তেমন একটা ভাল ভুট্টা হয়নি। সন্ধ্যা হতে চলছে, এমন সময় আমরা গাড়ি থেকে নামলাম।
মেটলি থানার চালসা হয়ে উপরের দিকে সামসিং টিলা পাহাড়ের শেষ সীমানায়। এ পথে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে রংপুর দিনাজপুর ময়মনসিংহ এলাকা থেকে এমনি ট্রাকে করে ১৫-২০দিন পর পর প্রশিক্ষনের জন্য বিভিন্ন ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধাদের আনা নেওয়া করতো।পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে সামসিং চা বাগান ছায়ানিবিড় বেষ্টিত একদম নিরিবিলি শান্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সুন্দর জায়গা, মাঝে মাঝে বহমান ছোট ছোট ঝরনা। ইহা সমুদ্রপৃষ্ট হ'তে আনুমানিক তিন হাজার ফিট উপরে। এখানে মানুষের বসবাস নেই। র প্রশিক্ষন শিবির তাই কোলাহল মুক্ত হওয়াই স্বাভাবিক। এ চা-বাগানের পূর্ব পাশ দিয়ে দক্ষিন দিকে দার্জিলিং পাহাড় থেকে উতপন্ন বহমান মুরতি নদীর ঝরনাধারা এঁকেবেঁকে চলছে, যা মেটলি থানার কাছ ঘেষে জলপাইগুড়ির কাছাকাছি এসে জলঢাকা নদীর সাথে মিশে মিলিত শ্রোত আরও নীচে নেমে অবশেষে তিস্তা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এ মুরতি নদীতে খুব বেশি পানি নেই। হাঁটুপানি তবে বেশ খরশ্রোতা। সাবধানে হেঁটে নদী পার হওয়া যায়।নদীর ওপারে দার্জিলিং আর এ পাশে জলপাইগুড়ি জেলা।
মুরতী নদীর পশ্চিম তীরে সামসিং চা-বাগান।একটা বিস্ময়ের বিস্ময়। বিরাট পাহাড়ের পাদদেশে নদী তীরে বিস্তীর্ণ সমতল ও পাহাড়ি ভুমি। মূল পাহাড়টি দার্জিলিংয়ের ভিতরে অবস্থিত। পাহাড়ের ঢালে এমন বিশাল সমতল ভুমি সাধারণত দেখা যায় না। ইন্দো-চীন যুদ্ধের সময় এ সমতল ভুমিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি সেনা ক্যাম্প তৈরি করেছিল।মুরতি নদীর তীরে হওয়ায় এটা মুরতি ক্যাম্প নামে নাম করন করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের এ ট্রেনিং ক্যাম্পটি মুজিব ক্যাম্প নামে পরিচিতি লাভ করে। মুজিব ক্যাম্পের এ জায়গায় এখনো ভারতীয় সেনাবাহিনী শীতকালীন মহড়া করে থাকে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকেরা আমাদের ব্রিফিং করল। নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিষের নাম যেমন ওয়াস রুমে যাওয়া,থালাবাটি মশারী ইত্যাদির হিন্দি নাম শিখিয়ে দিল। রাতের খাবার খেয়ে মুজিব কাম্পের পশ্চিম দিকের আলফা, ব্রেভো, চার্লি,ডেলটা ইকো কোম্পানির মধ্যে আলফা কোম্পানীর একটি রুমে ঘুমানোর জায়গা করে দেয়া হয়।
ঘুম থেকে উঠে মুরতি নদীতে গেলাম মুখ হাত ধুতে। মুরতি নদীর ঝরনার পানি খুবে ছচ্ছ । নদীতে নেমে পরলাম। পানি খুব ঠান্ডা। পানির নীচে ছোট বড় নানা রকমের পাথর।
নদী থেকে উঠে রুমে গেলাম। নাস্তা খেতে গেলাম ক্যাম্পের উত্তর দিকে। উত্তরে যাওয়ার পথে দেখলাম, আমার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কানু, আমার সহপাঠি কলেজ ও কলেজ হোস্টেলের বন্ধু আঃ মান্নান সহ পরিচিত স্কুল কলেজ এর কয়েকজন। চাচা আব্দুস সাত্তার ক্যাম্পে অবস্থানরত আপন ভাতিজা মোঃ নূরুল ইসলাম, এস এম শফিকুল ইসলাম, আমাকে নিয়ে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের সহকারে সকালের নাস্তা করে বড় মগ ভর্তি কাঁচাপাতা ছাকুনি ছাড়া চা ভাতিজাদের হাতে দিয়ে নিজে চা পান করেন। প্রশিক্ষন ক্যাম্পের দক্ষিণ দিকে অস্ত্রাগার,পশ্চিম দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কোম্পানি ও উইং আর তাদের থাকার জায়গা। উত্তর- পূর্ব কোনে পাহাড়ের নীচে, মুরতি নদীর তীরে অবসটেকল প্রশিক্ষনের স্থান।
মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষনের সময় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ট্রেনিং চলত। তারপর বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টায় শেষ হতো। এর মাঝে রাইফেল, গ্রেনেড, মর্টার ছোড়া , এসএমজি, এলএমজি, ইত্যাদি চালানো শেখানো হতো।
গেরিলা আক্রমণের মূলমন্ত্র ছিল হিট এন্ড রান। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিকে পাকিস্তানী সেনাদের আতংক ও ব্যতিব্যস্ত রাখতে এটা বেশী করে প্রয়োগ করা হতো। পরবর্তীতে সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
গেরিলা ট্রেনিং শারীরিক দিক দিয়ে খুবই পরিশ্রমের কাজ। মুজিব ক্যাম্পে ২১দিনের সাধারণ ট্রেনিং এবং ৫ দিনের জঙ্গল ট্রেনিং এর জন্য ভুটানের জংগলে নিয়ে যেত।রেকি করা, অ্যামবুশ করা, নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন দল করে কিভাবে সম্মুখ যুদ্ধ করা হয় তা প্রত্যক্ষভাবে করানো হতো। রাস্তার উপর ব্রীজ উড়ানো, মাইন পেতে গাড়ি উল্টোনো, রেললাইন উড়ানো, এল এম জি, এস এম জি, স্টেনগান, আর,সি,সি গান, রকেট লঞ্চার চালানো শেখানো হতো।
মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ নিজ এলাকার রাস্তাঘাট,ঝোপঝাড়, নদী, খালবিল সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান ছিল বলে প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে নিজ এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য পাঠানো হতো।
প্রবাসী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬১ জন কমিশন্ডনের কর্মকর্তার প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষন এ মুজিব ক্যাম্পে হয়, এ প্রশিক্ষনে বংগবন্ধুর পুত্র শেখ কামালও অংশগ্রহন করেন। শেখ কামাল মাঝেমাঝে গেরিলা প্রশিক্ষণার্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথাবার্তা বলতেন।সবাই অনুপ্রেরণা পেতেন।
মুজিবক্যাম্পে সেনাবাহিনীর কর্নেল দাশগুপ্ত, ক্যাপ্টেন যোশী, ক্যাপ্টন মুখার্জী,ক্যাপ্টেন ব্রেভো ও বাংগালী হাবিলদার নিমাইচন্দ্র বাগ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দিতেন। গেরিলা প্রশিক্ষন কেন্দ্র মুজিব ক্যাম্পের এ রকম হাজার হাজার স্মৃতি



সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর