রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে আড়াই বছর ধরে গাছের সাথে শেকলে বাঁধা বৃদ্ধা লতিফুন!
জাহাঙ্গীর আলম শাহীন: দুই দিন কিংবা এক-দুই মাস নয়। টানা দুই বছর ধরে বাড়ির উঠানে রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে শেকলে বাঁধা রয়েছেন বৃদ্ধা লতিফুন বেগম (৬৫)। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না বিধবা বোন নুরজাহান বেগম। লতিফুন বেগম লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের উত্তর গোবদা গ্রামের শঠিবাড়ি বাজারের পূর্ব পার্শ্বে নুরজাহানের স্বামী পরিত্যক্তা বোন।
গ্রামবাসিরা জানান, প্রায় আড়াই বছর আগে একমাত্র বোবা সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী লতিফুনকে তালাক দেন জেলার আদিতমারী উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নের দীঘলটারী গ্রামের আছিমুল্লাহ। এরপর লতিফুনের ঠাঁই হয় সঠিবাড়ি বাজারের পূর্ব পাশে দুর্গাপুর ইউনিয়ন ফেডারেশন ভবনের সামনে বিধবা বোন নুরজাহানের কাছে । নুর জাহানের একটি মাত্র ঘরে। ওঠাই নুরজাহানের বাড়ি। নুরজাহানের ছেলে মেয়েরা সবাই বিয়ে করে ঢাকায় অবস্থান করছে। তাই সরকারিভাবে পাওয়া বিধবা ভাতার অর্থ ও ঝিঁয়ের কাজ করে চলে নুরজাহানের সংসার। সেখানে একাই চলতে পারেনা সেখানে এসে প্রায় আড়াই বছর আগে যোগ হয় তালাক প্রাপ্ত মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়া বৃদ্ধা বোন লতিফুন বেগম(৬৫)।
মানসিক ভারসাম্যহীন বোনকে সুস্থ করতে ধারদেনা করে বেশ কিছুদিন রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকার চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করান বিধবা নুরজাহান। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার অভাবে দিনদিন অবনতি ঘটে। অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে লতিফুনের চিকিৎসা। মানসিক ভারসাম্যহীন এ বৃদ্ধা পথচারীসহ বাজারের দোকানপাট ও এলাকাবাসীর ঘরবাড়িতে ঢুকে জিনিসপত্র ক্ষতি করতে শুরু করেন। তাই তাকে শেঁকলে আটকিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। মানষিক প্রতিবন্ধি হলেও বৃদ্ধা লতিফুন অন্যের রান্না করা খাবার খায় না। শেঁকলে বাঁধা গাছতলায় একটা চুলায় নিজের খাবার নিজেই তৈরী করেন। তাই গাছ তলায় পাতিল, লাকড়ি ও রান্নার সামগ্রী রয়েছে। প্রতিদিন খাবারের সময়ের আগে সাধ্যমত চাল ডাল ও পানি সরবরাহ করেন বোন নুরজাহান। সেখানে নিজে রান্না করেই খাবার খান প্রতিবন্ধী লতিফুন বেগম। এক বছর আগে উপজেলা সমাজসেবা অফিস বৃদ্ধা লতিফুনের নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। সেই টাকা উত্তোলন করে তাকে খাওয়ান বিধবা বোন নুরজাহান। ওই গ্রামের মাহফুজার রহমান  জানান, মাথায় সমস্যা থাকায় ছেড়ে দিলে মানুষের ক্ষতি করে। তাই তাকে শেঁকলে বেঁধে রেখেছেন  বোন। উন্নত চিকিৎসা হলে হয়তোবা সুস্থ হতেন লতিফুন। কিন্তু তার তো কেউ নেই। একমাত্র বিধবা বোন নিজেই খেতে পারেন না। তিনি  চিকিৎসা করাবেন কীভাবে।
লতিফুনের বোন নুরজাহান জানান, বোন বৃদ্ধা লতিফুন পাগল। ছেড়ে দিলে অন্যত্র চলে ডায়। গ্রামের মানুষের ক্ষতি করে। তাই পায়ে শেঁঁকল দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। ঘরে বেঁধে রাখলে ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে। তাকে সুস্থ করতে চিকিৎসকরা পাবনা মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু, গরিব মানুষ নিজে খাইতে পারি না। বোনের চিকিৎসা কী দিয়ে করাবো। তাই তিনি প্রতিবন্ধী বোনের চিকিৎসার জন্য সরকারি মহল বা সমাজের বিত্তবানদের সাহায্য কামনা করেন।
দুর্গাপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার কাজী মাহমুদুল হাসান জুয়েল জানান, সুখের সংসার ছিল লতিফুনের। স্বামী তাকে তালাক দেয়। তারপর হতে  মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। গরীব বোন নুরজাহান সাধ্যমত চিকিৎসা করালেও উন্নত চিকিৎসা হয়নি। প্রতিদিন মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে ক্ষতি করত। তাই প্রায় আড়াই বছর ধরে পায়ে ছিকল বেঁধে রেখেছেন পরিবার। সরকারি বা বেসরকারি ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করলে তার সুচিকিৎসা দিলে তিনি সুস্থ হতেন। তাই সরকারি উচ্চ মহলের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এক নজরে- এর অন্যান্য খবর