আসামের ১৯ লাখ মানুষ ‘রাষ্ট্রহীন’
বার্তা মনিটর: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের তীব্র আলোচিত ও সমালোচিত নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রকাশ করা হয়েছে। এই তালিকা অনুসারে আসামের নাগরিকসংখ্যা এখন তিন কোটি ১১ লাখ। আর রাষ্ট্রবিহীন মানুষের সংখ্যা ১৯ লাখ। কী ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য তা অনিশ্চিত। বলা হয়েছে, এরা দফায় দফায় আবেদন করার সুযোগ পাবে। সে ক্ষেত্রে হয়তো আরো কয়েক লাখ লোক আসামে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু বাকি কয়েক লাখ মানুষের অনিশ্চয়তা তাতেও কাটবে না। বলা হচ্ছে, এদের ঠাঁই হবে আটককেন্দ্রে। কিন্তু সেটা কত সময়ের জন্য, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শুরু থেকেই এমন অভিযোগ আছে, আসামে আশ্রয় নেওয়া এসব ‘বিদেশি’ মূলত বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মুসলমান। কিন্তু প্রকাশ করা তালিকায় দেখা গেছে, মুসলমানের তুলনায় হিন্দুদের সংখ্যা বেশি। তবে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে আসামে বন্যা হলে যেমন তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে, তেমনি এনআরসির প্রভাবও পড়বে। বিষয়টিকে নেহাতই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আসামে প্রথম এনআরসি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ১৯৭৯ থেকে নিখিল আসাম ছাত্র ইউনিয়ন বা ‘আসু’ আসামে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে অভিযোগ করে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন শুরু করে। চার দশক ধরে তারা বলছেন, ৮০ লাখ বাংলাভাষী আসামে অবৈধভাবে বসবাস করছে। রাজনৈতিক সংগঠন এবং আসামের প্রশাসন এত দিন বাংলাদেশ থেকে ‘প্রতিদিন কয়েক হাজার’ মানুষের আসামে অভিবাসনের কথা পুনঃপুনঃ প্রচার করে আসছিল। আসামের একজন রাজ্যপাল অজয় সিং ২০০৫ সালে দাবি করেছিলেন, প্রতিদিন সেখানে ছয় হাজার করে বাংলাদেশি ঢুকছে। আরেক রাজ্যপাল নিবাস কুমার সিনহা ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণনকে চিঠি লিখে দাবি করেছিলেন, এই রাজ্যে ৪০ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে। এই চিঠির পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বসানো শুরু হয়। আসু এ সময় আসামে ৮০ লাখ বাংলাদেশির অস্তিত্বের কথা বলেছিল রাজনৈতিক জনসভাগুলোতে। কল্পিত এসব সংখ্যাই ছিল আসামের রাজনীতিতে তাদের এত দিনের পুঁজি। তাদের চাপের কারণে ১৯৮৫ সালে ক্ষমতাসীন রাজিব গান্ধী সরকার তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এতে বলা হয়, নাগরিকপঞ্জিতে ঠাঁই পেতে হলে বাসিন্দাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগে রাজ্যে আবাস গেঁড়েছে। ধীরে ধীরে আসামে ‘বিদেশি’ শনাক্ত করার বিবিধ কার্যক্রম শুরু হয়। যার বড় অধ্যায় শেষ হলো প্রায় ৩৪ বছর পর, ২০১৯ সালের আগস্টে এসে।
ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে আসাম হলো একমাত্র রাজ্য, যেখানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন’ বা এনআরসি সম্পন্ন করা হলো। এর খসড়া তালিকা গত বছর প্রকাশ করা হয়। তাতে ৪১ লাখ মানুষকে অবৈধ বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করে তাদের আসামের নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেই মানুষের মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করে। সর্বশেষ ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আসামের ১৯ দশমিক ছয় লাখ মানুষকে নাগরিকত্বহীন এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন ঘোষণা করা হলো।
কিন্তু এবারের তালিকায় হিন্দুদের সংখ্যা অনেক বেশি। রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় নাখোশ। এনআরসি নিয়ে এত দিনের পুরো প্রকল্প বুমেরাং হয়ে গেছে বলে উপলব্ধি তাদের। আসুও এই তালিকাকে গ্রহণ করেনি। তারা আবারও সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করবে বলে জানিয়েছে।
এদিকে আসামে ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত এনআরসি ঘোষিত হলেও বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। শুধু রাজনৈতিকভাবে তো নয়ই, এমনকি প্রশাসনিকভাবেও আরো দীর্ঘ সময় এর ধারাবাহিকতা চলবে। এ মুহূর্তে যারা নিজেদের নাম চূড়ান্ত এনআরসিতে খুঁজে পায়নি, তারা অনেকেই আবার আইনগত আবেদনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। মূলত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে  (এফটি) এই আবেদন যাবে। এইরূপ প্রায় এক হাজার ট্রাইব্যুনাল কাজ করতে শুরু করবে আগামী মাস থেকে। এ জন্য বাদ পড়াদের ১২০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে প্রত্যাখ্যাতরা গুয়াহাটি হাইকোর্টেও যেতে পারবে। সর্বশেষ তাদের জন্য সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে এই বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ৪০ হাজার রুপি এই প্রক্রিয়ার জন্য খরচ হবে। কিন্তু বাদ পড়া নাগরিকদের বেশির ভাগই দরিদ্র। তারা কী করে এই ব্যয় বহন করবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এখন প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে একেবারে শেষ পর্যায়ে যারা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হবে, তাদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আসাম কিংবা ভারত সরকার—কেউই স্পষ্টভাবে কিছু বলছে না। তবে আইনগত অনুমান হলো, এদের আটক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে। আসামে এ রকম অনেক ডিটেনশন ক্যাম্প এরই মধ্যে কাজ করছে এবং আরো নির্মাণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আসামের রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের ধারণা, চূড়ান্তভাবে ‘বিদেশি’ সাব্যস্তদের এক ধরনের বিশেষ ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে বিশেষ অঞ্চলে রাখার ব্যবস্থা করা হতে পারে।
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের মতো ভারতের আসামে বিশালসংখ্যক রাষ্ট্রহীন মানুষ তৈরি হতে চলেছে। তাদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে কি না তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ইঙ্গিত নেই। সরকারি শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা তারা পাবে কি না তা-ও নিশ্চিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, জমিজমা রাখতে পারবে কি না সেটাও অস্পষ্ট। তবে এদের কোনোভাবেই ভোটারতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না—সেটা নিশ্চিত।
এখানেই বাংলাদেশ প্রসঙ্গটি চলে আসে। এর আগেরবারের মেয়াদে, এমনকি এবারের লোকসভা নির্বাচনে প্রচাণার সময় বিজেপি বলেছে, তারা এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তাঁর সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘এটা একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ বাংলাদেশও বিষয়টিকে সেভাবেই দেখতে চায়। তবে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির আইনজ্ঞ সেলের সদস্য ও দলের নেতা বিবেক রেড্ডি তালিকা ঘোষণার পরপরই জানান, ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বাংলাদেশ সরকারকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছেন, সেটাকেই শেষ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই। ভবিষ্যতে অনেক কিছু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ কাজেই নিশ্চিন্ত না হয়ে সতর্ক থাকাই হয়তো ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণকর হবে।
বিদেশ বার্তা- এর অন্যান্য খবর