লালমনিরহাট জেলায় উদ্যোক্তাদের মাঝে যন্ত্রচালিত পাটের আঁশ ছাড়ানোর মেশিন আঁশকল বিতরণ
স্টাফ রিপোর্টার: বেশি আঁশ, ভালো মান, তাড়াতাড়ি হাটে,আঁশকল মানে বেশি লাভ পাটে এই স্লোগানকে ধারণ করে গত ৭ আগস্ট লালমনিরহাট আরডিআরএস বাংলাদেশ  অফিস প্রাঙ্গনে এক  আড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যোক্তাদের মাঝে যন্ত্র চালিত পাটের আঁশকল বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা প্রসাশক আবু জাফর উদ্যোক্তাদের মধ্যে আঁশকল বিতরন এর উদ্বোধন করেন। সভাপতিত্ব করেন প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশ প্রকল্প সমন্বয়কারী নির্মল চন্দ্র বেপারী। এ সময় বিশেষ অতিথি ছিলেন সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক, মূখ্য পাট পরিদর্শক মহোফেজ উদ্দিন, আরডিআরএস রিজিওনাল ম্যানেজার (ক্ষুদ্র ঋণ) আবু সাইদ, লালমনিরহাট বার্তার সম্পাদক গেরিলা লিডার ড. এস এম শফিকুল ইসলাম কানু। প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশ ও আরডিআরএস বাংলাদেশ এর বিভিন্ন কর্মকর্তাগন, সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ এবং ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে  লালমনিরহাট জেলার ১০ জোড়া উদ্যোক্তাদের (প্রতি জোড়ায় ১ জন পুরুষ ও ১ জন নারী) মধ্যে আঁশকল বিতরণ করা হয়।
সোনালী আঁশ এর দেশ বাংলাদেশ। এই সোনালী আঁশ “পাট” বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অতীতে প্রধান রপ্তানী পণ্য হিসেবে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হত পাট থেকে। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম আঁশ ও বিভিন্ন সিনথেটিক দ্রব্যের আবির্ভাব, এর সহজলভ্যতা ও তুলনামূলকভাবে স্বল্প দামের কারণে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা ও মূল্য হ্রাস পেতে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের জন্য ক্ষক্ষতিকর অপরিশোধিত বর্জ্য দারা পরিবেশ দূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পরিবেশ বান্ধব পাট ও পাট পণ্যের প্রতি পুনরায় বিশ্ব সমাজের আগ্রহ ও চাহিদা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রচলিত পাটপণ্য সামগ্রির পাশাপাশি বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিভিন্ন কারনে বাংলাদেশের পাট শিল্প বর্তমান বৈশ্বিক এবং স্থানীয় বাজারের প্রতিযোগীতায় অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে। আর এই পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হল গুনগত মান সম্পন্ন পাটের আঁশ এর অভাব। পানি সংকটের কারণে পাট চাষীরা পাট কাটার পর স্বল্প পরিসরে সনাতন পদ্ধতিতে জাগ দেয়ার কারণে পাটের মান ক্রমাগত নষ্ট হচ্ছে। সেই সাথে অন্যান্য উন্নত দেশের মত পাটের আঁশ পঁচানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যান্ত্রিকিকরনের অভাবে পাটের মান ভালো না হওয়ায় কৃষক পাটের ভাল দামও পাচ্ছেন না।
এই সকল সমস্যার সমাধানকে সামনে নিয়ে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এর অর্থায়নে প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন, গত ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ইং থেকে জুট টেক্সটাইল ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পটি আরডিআরএস বাংলাদেশ এর মাধ্যমে রংপুর চেম্বারস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড, রংপুর জেলা লেদ মেশিন শ্রমিক ইউনিয়নকে সাথে নিয়ে গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় বাস্তবায়ন করছে।
এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাজের মধ্যে একটি হল যান্ত্রিক  পদ্ধতিতে পাটের আঁশ ছাড়িয়ে উন্নত পদ্ধতিতে পাটের আঁশ পঁচানোর মাধ্যমে পাটের আঁশের মান উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে গত দুই বছরে লালমনিরহাট জেলায় ২৬টি সহ উত্তর বঙ্গের ৪টি জেলায় মোট ১০৪টি পাটের আঁশ ছাড়ানোর সেমিঅটোমেটিক মেশিন আঁশকল কৃষি উদ্যোক্তাদের মধ্যে দেয়া হয়। যা দিয়ে পাট চাষীরা বেশ সহজে অল্প সময়ে অধিক পাটের আঁশ ছাড়িয়েছে যাতে তুলনামূলক খরচও কম লেগেছে। এ পদ্ধতিতে ছাড়ানো আঁশ কম সময়ে অল্প পানিতে পঁচানো সম্ভব হয়েছে এবং আঁশ এর মান ও বেশ ভাল হয়েছে। এই প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য ও কৃষক বান্ধব করার জন্যে এ বছর স্থানীয় মেটাল ওয়ার্কশপে পাটের আঁশ ছাড়ানোর সেমিঅটোমেটিক মেশিন আঁশকলগুলো তৈরী করা হয়েছে। যে মেশিন গুলোতে গত বছর এর অভিজ্ঞতার আলোকে বেশ কিছু সংস্কার ও কারিগরী উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। যার ফলে পাটের ছাল ছাড়ানো ছাড়াও মেশিনটির কিছু যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে সহজেই ধান/গম/ভূট্টা মাড়াই এর কাজে ব্যবহার করা যাবে। এতে কৃষক মেশিনটি বিভিন্ন মৌসুমে বছর ব্যাপী ব্যবহার করে সর্বাধিক উপার্জন করতে পারবে। এই “আঁশকল” উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণের পূর্বে এর পরিচালনা, রক্ষণাক্ষেণ, শারীরিক নিরাপত্তা সহ বেশ কিছু বিষয়ে আরডিআরএস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে লালমনিরহাট ৪ দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ এর আয়োজন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আঁশকল গুলো বিতরণ করা হয়।
ইতিবাচক লালমনি- এর অন্যান্য খবর