বঙ্গবন্ধু : চৈতন্যের নিবিড় বন্ধনে
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহআলম: স্বপ্নের বিনাশ নেই, স্বপ্ন হারায় না কখনো । বাঙালির স্বাধীনতার  স্বপ্নও হারায়নি। স্বাধীকার অর্জনের মাধ্যমে বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের মুক্তির আকাক্সক্ষা পূর্ণতা পেয়েছে। নিস্তার মিলেছে পাকিস্তানী শাসন - শোষণ ও অত্যাচার থেকে। স্বাধীন ভূমিতে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুনে গেছেন সমৃদ্ধির বীজ ।
‘এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্যসেনের থেকে।
এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে।
এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে।
এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।’Ñ
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক হয়ে আমাদের প্রেরণা জোগায়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, আমাদের জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানী শাসন,শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বাঙালি। পাকিস্তানী কারাগারে  মৃত্যুর প্রহর গুণেছেন কিন্তু স্বাধীকার আন্দোলন থেকে সরে আসেননি সামান্যতম। কারাগারের নিভৃত প্রকোষ্ঠে দুশ্চিন্তার মেঘ, কিন্তু অন্তরে বাংলার দুখী, নির্যাতিত মানুষের মু্িক্তর তীব্র আকাক্সক্ষা। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ছয় দফার আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের অধিনতা মুক্তির প্রলয় আনেন তিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র নামের মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে বাংলায় সুচিত হয় গণ-অভ্যুত্থান। পাকিস্তানী শামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর নিরঙ্কুশ বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা না দিয়ে বাঙালি নিধনের নীলনকশা আঁকে। বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা দাবী আদায়ে প্রবল আন্দোলনে অগ্রগামী পূর্ব বাংলার মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের পথ বেছে নেয়। ৭১ এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর বজ্যকণ্ঠে জানিয়ে দেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে পাকিস্তানী হানাদাররা নির্বিচারে বাংলার মুনুষকে নিধন করতে থাকে। পৈশাচিক শক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে, ২৬ মার্চ রাতেই বাংলার মানুষের কান্ডরী, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। গঠিত হয় মুজিব নগর সরকার। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় চলে মুক্তিযুদ্ধ। মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে মুক্তির সংগ্রামে অনেক ত্যাগে বিজয় ছিনিয়ে আনে বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, দেশ প্রেমিক আপামর মানুষ। অবশেষে বীরের বেশে ৭২ এর ১০ ই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মানচিত্রে আসেন বাংলার মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা, স্বাধীনতার মূর্তপ্রতীক, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এসে বাঁধভাঙা আবেগে তিনি বলেনÑ‘ভাইয়েরা আমার, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ দানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বাংলার কৃষক ,শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার প্রতি জানাই সালাম। ’ দেশের মুক্তির জন্য জীবনদান কারি শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি প্রথমেই বলেছেনÑ‘যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যাঁরা বর্বর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাঁদের আত্মার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই এমন প্রত্যয়ে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারণÑ‘আমি জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে পরে সুখে থাকবে, এটাইছিলআমারসাধনা। কবিগুরুরআক্ষেপ মোচনকরে বঙ্গবন্ধুর গর্বিতঅনুভবÑ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ কবিগুরুরর এই আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। বাঙালি জাতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা মানুষ, তারা প্রাণ দিতে জানে। এমন কাজ তারা এবার করেছে যার নজির ইতিহাসে নাই।’ বিশ্ব বিবেকের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দোবার আন্তরিক আহ্বানÑ গত দশ মাসে সেনাবাহিনী বাংলাকে বিরান করেছে। বাংলার লাখো লাখো মানুষের আজ খাবার নাই, অসংখ্য মানুষ গৃহহারা। এদের জন্য মানবতার খাতিরে আমরা সাহায্য চাই। ..বিশ্বের সকল মুক্ত রাষ্ট্রকে অনুরোধ করছিÑবাংলাকে স্বীকৃতি দেন।’ বাংলাতেই পূর্ণ সমর্পিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিবিড়  ভালোবাসায় অকপটকথনÑ ‘আমার সোনার বাংলা আমি অত্যন্ত ভালোভাসি।’... দরদীপ্রাণ বঙ্গবন্ধু ও বাংলা এ ভাবেই মিলেমিশে একাকার।
দিনের আলোর মতো সত্য হলো শেখ মুজিবই প্রথম সফল রাজনীতিবিদ যিনি তার অসাধারণ রাজনীতি প্রতিভায় জাতির অসাম্প্র্রদায়িক চরিত্রকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন। ধর্মীয়দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কুসংস্কার, লোভ-ষড়যন্ত্র-দাস্ত্ব থেকে মুক্তিদাতা তিনি। তিনিই জাতিকে ধর্মীয় গোড়ামীর আর কুসংস্কারের উর্ধে তুলতে পেরেছিলেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেনÑবাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আরতা কোন ধর্মভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রেরভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। ‘যার যার ধর্ম তার তার’Ñধর্মনিরপেক্ষতার  এ ব্যাখ্যা বঙ্গবন্ধুই প্রথম উপস্থাপন করেন। ধর্মের নামে বেঈমানী, ব্যাভিচার,শোষণ, মানবতার অপরাধ, খুনকে ঘৃণা করতেন বঙ্গবন্ধু। তাই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করেছিলেন ধর্মভিত্তিক অপরাজনীতি। অশুভ শক্তি তার অবর্তমানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ করে দিলেও প্রজন্ম তা মেনে নেয়নি।   সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবীতে সোচ্চার তারা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াস অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছিন্ন। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, লোভীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বক্তব্যে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি না খেলার আহ্বান জানিয়েছেন বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে। কিন্তু দেশ আজও দুর্নীতিমুক্ত হয়নি, মানুষের জীবন কেড়ে নিতে কুণ্ঠিত নয়ঘাত করা, ঘুষের তরঙ্গ থামছে না। রাস্তায় মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ। এমন অবস্থা থেকে দ্রুত মুক্তি দরকার। এজন্য প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর মতো দেশ প্রেমিক হওয়া। মুখে শুধু নয় কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে আমরা দেশ প্রেমিক। জাতিরজনকের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নত দেশের মর্যাদা দিতে আন্তরিকতা নিয়ে দিনান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। কিন্তু তিনি একাকী পারবেন? না দরকার দেশে সব মানুষের সহযোগিতা। তাই বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের কথা স্মরণ করে মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ নয়, ঘুষনয়, কাজে ফাঁকি নয়, মানুষকে ঠকানো নয় সবার দায়িত্ব সুচারু পালন করতে হবে। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু বলেছেন- ‘টিকিয়া থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি। আমাদের লক্ষ্য স্ব-নির্ভরতা।’ ।
বঙ্গবন্ধু না থাকলে বাংলাদেশ উন্নত হবে না, এগিয়ে যাবে না, সাম্প্রদাযিক অপশক্তি আবার থাবা বিস্তার করবে এ চিন্তা থেকেই বাংলা অন্তপ্রাণ বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধুকে তাঁর স্বাধীন স্বদেশে বেশি দিন বাঁচতে দেয়নি বিশ্বাসঘাতকরা। উত্তপ্ত বুলেটে ঝঁজরা করেছে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর প্রসারিত বুকÑতবু তিনি মাথানত করেননি  কোনো অপশক্তির কাছে। ন্শ্বর পৃথিবীতে মুজিব নেই, কিন্তু সর্বব্যাপী তাঁর অবস্থান। বাঙালির চিরন্তন আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক তিনি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, উদার চৈতন্যের অনন্য ধারক ও  বাহক।  মুক্ত জীবন ভাবনার প্রবক্তা হয়ে মুজিব বিশ্ব সমাজে নন্দিত হবেন চিরকাল। তিনই থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের চৈতন্যের নিবিড়বন্ধনেÑ
‘এই বাংলার আকাশ বাতাস, সাগরগিরি ও নদী
ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু ? ফিরিয়া আসিতে যদি
হেরিতে এখনও মানব হৃদয়ে তোমার আসন পাতা
এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতাপিতা বোনভ্রাতাÑ’
[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, ভূতপূর্ব অধ্যাপক,বাংলা, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর]




সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর