মৌলানা আবুল কালাম আজাদ মানবতাবাদী রাজনীতিক
আবদুস সালাম: মৌলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮-১৯৫৮) ভারতীয় উপমহাদেরে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীর। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব ও অসীম মনোবলের দরুন ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ বেনিয়া শাসকদের প্রায় দুশো বছরের দুঃশাসনের অবসান ঘটে। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করতে যারা অশেষ ত্যাগ স্বীকার করেছেন,মৌলানা আজচাদ তাদের অন্যতম। তিনি একই সঙ্গে খ্যাতিমান আলেম মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, দক্ষ রাজনীতিক, বিজ্ঞ কুটনীতিক, সমাজসেবক ও স্বাধীন ভারতের অন্যতম স্থপতি।
এ খ্যাতিমান ব্যক্তি ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৮ সনে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯০৩ সনে দরসে নিজামিয়ার সিলেবাস অনুসারে শিক্ষা লাভ সমাপ্ত করার পর প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতির পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত প্রায় সব শিক্ষণীয় বিষয় তার পিতার শিক্ষকতায় পূর্ণভাবে আয়ত্ত করেন। এরপর ব্যক্তিগত গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে আজাদ বিভিন্ন বিদ্যায় অসাধারণ পান্ডিত্য অর্জন করেন। উর্দু, হিন্দি, আরবি, ফারসি সাহিত্য ছাড়াও ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় তাঁর অপ্রতিহত দখল ছিল।
আজাদ এগার বছর বয়স থেকেই উর্দু কবিতা রচনা করতে থাকেন। তাঁর প্রথম জীবনের লেখা গজলসমূহ আরমুগানে ফাররুখ বোম্বাই আর খিদাঙ্গে নজর লখনৌতে ছাপা হয়। নায়রঙ্গে আলম নামে একখানি কাব্যসংগ্রহ তিনি নিজে প্রকাশ করেন। এ সময়ে তিনি গদ্য রচনা শুরু করেন। তার প্রাথমিক প্রবন্অগুলি আহসানুল আখবার ও তুহফায়ে আহমাদিয়া কলকাতায় এবং মাখযান লাহোরে প্রকাশিত হয়। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর পনের বছর বয়সে আজাদ কলকাতা থেকে মাসিক পত্রিকা লিয়ানুস সিদুক প্রকাশ করেন। ১৯০৪ সালে আনজুমানে হিমায়াতে ইসলামের (লাহোর) বার্ষিক সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতা সকলৈর প্রশংসা লাভ করে।
১৯৯২ সালের ১৩ জুলাই আজাদ নিজের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে বিখ্যাত উর্দু সাপ্তাহিক আল-হিলাল প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম জনসাধারণকে স্বাধীনতা ও রাজনীতিতে স্বকীয় মত ও কর্মের দিকে আহবান করা। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশের অপরাধে আল-হিলালের যামানত জব্দ হওয়ায় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯১৫ সালের ১৩ নভেম্বর আল হিলালৈর নামান্তর আল বালাগ প্রকাশিত হয়।
তুরস্কোর অটোমান সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের বিপক্ষে যোগ দেওয়ায় ব্রিটিশ সরকারের বাংলা প্রাদেশিক সরকার তুরষ্কোর প্রতি আস্থাশীল ভঅরতীয় রাজনীতিকদের প্রতি বিরূপ হয়ে আজাদকে চারদিনের মধ্যে বাংলার বাইরে চলে যেতে আদেশ জারি করেন। আজাদ ১৯১৬ সালের মার্চে বিহারের বাঁচি যান। সেখানে তিন বছর নয় মাস  তাঁকে নজরবন্দী রাখা হয়। পত্রিকা আল বালাগ বন্ধ হয়ে যায়।সে সময়ে দু’বার রাচিতে ও তিনবার কলকাতায় বাড়ি তল্লাশি করে আজাদের কতগুলি গ্রন্থের পা-ুলিপি পুলিশ নিয়ে যায়। নজরবন্দী থাকাকালীন আজাদ রাঁচিতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে কলেজে উন্নীত হয়। ১৯২০ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। তখন দেশে স্বাধীনতার পক্ষে ও খিলাফত রক্ষার জোর আন্দোলন শুরু চলছিল। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারীতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক খিলাফল কনফারেন ্স- এর সভাপতি হিসেবে আজাদ খিলাফত ও আরব উপদ্বীপ সম্পকেৃ একটি তাত্ত্বিক বক্তৃতা প্রদান করেন যা ব্যাপক স্বীকৃতি ও প্রশংসা লাভ করে। এ বক্তৃতাতেই প্রথম মুসলমানদের সরকারের সঙ্গে অসহযোগের আহবান জানানো হয়। তারপর তিনি সর্বপ্রকারে এই আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। এ জাতীয় রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য ১৮২১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার করে একবছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে জেল থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
উর্দু সাংবাদিকতা ছাড়াওমৌলানা আজাদ তাযকিরা, তারজুমানুল কুরআন, কাওলে ফায়সাল, গুবারে খাতির, মাসআলায়ে খিলাফত আওর জায়ীরাতুল আরব, জামিউশ শাওয়াহিদ এবং ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডমস হ বহু কালজয়ী গ্রন্থের রচনা করেন।
মৌলানা আজাদ চারবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন এবং ছয়বার কারাবরণ করেন। আজাদের বন্দীজীবনের মোট দীর্ঘ নয় বছর আট মাস তথা জীবনের প্রায় এক সপ্তমাংশ। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতার পর তিনি ভঅরত সরকারের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হয়ে জীবনের শেষ পর্যন্ত উক্ত পদেই বহাল ছিলেন।
১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী আজাদ দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন এবং দিল্লি জামে মসজিদের সামনের উদ্যানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। দেশ ও জাতি সেবায় স্বীকৃতি স্বরূপ ভঅরত সরকার ১৯৯২ সালে আজাদকে (মরণোত্তর) ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘ভারতরতœ’  পদকে ভূষিত করেন। সদ্য স্বাধীন ভারতে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন ও প্রসারে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তার জন্মদিন ১১  নভেম্বরকে জাতীয় শিক্ষা দিবস পালন করেন।
মৌলানা আজাদ উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রাণপুরুষ ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার পথে আহবান করেন। আজাদ একজন একনিষ্ঠ ভারতীয় জাতীয়তবাদী নেতা। তাঁর চেতনা অখন্ড  ভারতের জাতীয়তাবাদ। তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে পাকিস্তান পরিকল্পনার ঘোর বিরোধী ছিলেন।
পৃথিবীর কিছু অংশ পাক আর অবশিষ্ট অংশ নাপাক- এ জাতীয় সংকীর্ণ মনোভাবের তীব্র বিরোধীতা করে অখন্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা আজাদ বলেন, ‘ভারতীয় মুসলমানদের নিছক কল্যাণ যা ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তান নামক একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বারা বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ যুযুধান ভঙ্গিতে মুখোমুখি দন্ডায়মান দুটি রাষ্ট্রেরকোনটিই নিজ নিজ সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান করতে পারবে না বরং পরিনামে কেবল উভয় দেশে সংখ্যালঘুরা প্রতিভূ হয়ে পড়বে এবং তাদের ওপর প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসামূলক আচরণে মানবতা লংঘিত হবে। এ জন্য পাকিস্তান পরিকল্পনাকে তিনি পরাভূত  মনোভাবের প্রতীক এবং নিশ্চিতভাবে ভীরুতার নিদর্শন মনে করতেন। ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা আজাদ পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, শুধু ধর্মীয় অভিন্নতা; অন্যদিকে ভৌগোলিক, আর্থিক, ভাষা ও সংস্কৃতির মত নানা দিক থেকে ভিন্ন মানুষদের একসূত্রে আবদ্ধ করতে পারে এ কথা বলা জনগণের সঙ্গে প্রচন্ডতম প্রতারণার তূল্য।
আজাদের মতে দেশের আসল সমস্যা আর্থিক, সাম্প্রদায়িক নয়। পার্থক্য শ্রেণিভিত্তিক, সম্প্রদায়ভিত্তিক নয়। তাই তিনি স্বজাতিকে সাম্প্রদায়িক বিবাদ ত্যাগ করে শিক্ষা-দীক্ষা ও আর্থিক উন্নতির দিকে আহবান করেন। শুধু ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান তাদের সব ভেদাভেদ ভুলে একটি জাতি ও রাষ্ট্র হতে পারবে কি না বা টিকবে কি না এ বিষয়ে আজাদের যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। আর তাঁর এ সংশয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের মধ্যে দিয়ে সত্যে পরিণত হয়েছে। আজাদের বাণী আজ দৈববাণীর মর্যাদা লাভ করেছে।
তবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর তার সঙ্গে পারস্পরিক সৌহার্দের সম্পর্ক গড়ে ওঠা উচিত বলে তিনি মত দেন। কারণ তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদের উপরে উঠে এক সত্যিকার দেশপ্রেমিক, জাতীয়বাদী ও মানবতাবাদী রাজনীতিবিদের আসনে সমাসীন হয়েছিলেন। তাঁর রাজনীতি ছিল বরাবরই মানব কল্যাণে নিবেদিত। তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও বিছিন্নতাবাদকে মনেপাণে ঘৃণা করতেন।
মৌলানা আজাদের দুরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তাধারা তৎালীন কিছু মানুষের নিকট অস্পষ্ট থাকলেও বর্তমানে তার দর্শন ও প্রজ্ঞা সুধীসমাজে সমাদৃত। তার রচনাবলী চিন্তার খোরাক যোগায়, তার কর্মস্পৃহা কর্মবিমুখ মানুষের পথের দিশা দেয়, তাঁর দেশপ্রেম ও জাতীয়বাবোধ আমাদের জীবনের আলোক বর্তিকা। উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে মৌলানা আজাদ তাই যথার্থই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
আবদুস সালাম মৌলানা আজাদ বিষয়ে পিএইচ ডি গবেষক
উর্দু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।





শিক্ষা বার্তা- এর অন্যান্য খবর