পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন
বার্তা মনিটর: পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনায় ছিল। দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও এই আইনের অধীনে ছিল না কোনো বিধিমালা। ৬ বছর পর সম্পত্তি এই আইনের অধীনে বিধিমালা তৈরি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ টুডের সূত্রমতে গত ১০ এপ্রিল খসড়া এ বিধিমালা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। আইনের অস্পষ্টতা দূর করতে বিধিমালায় বিষয়গুলোকে বিস্তারিত করার যে চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে, দুঃখজনকভাবে তা আইনটিকে পুত্রকেন্দ্রিক করে তুলেছে।
ভরণপোষণ ও আইনের যোগ
বলা হয়ে থাকে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি আইনের পরিপূরক। বস্তুত, সমাজের সমস্ত অনুষঙ্গ আইন করে লিখে রাখা সম্ভব নয়। সমাজ আপনা আপনিই এই শৃঙ্খলা বজায় রাখে। মূলত আইন তখনই তৈরি হয়, যখন সমাজে প্রচলিত কোনো নিয়ম তার আবেদন হারায়। আইন-আদালতের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তখন বাঁচিয়ে রাখতে হয় নিয়মটিকে।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩। স্মরণাতীতকাল থেকে চলে আসা পিতা-মাতার দেখভাল করায় সন্তানের যে নৈতিক দায়িত্ব, তা এখন আইনের আওতায় বিচারযোগ্য। এর পেছনে হতাশাও অনেক। পিতা-মাতার প্রতি নৈতিক দায়িত্ব ইদানীং এমনভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে যে, এই নৈতিক দায়িত্বকে আইন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিষয়টি আমাদের ভালোবাসা থেকেই আসা প্রয়োজন। আইনের ভয় দিয়ে দায় আদায় করা যায়, দরদটা ঠিক পাওয়া যায় না।
মূল আইনের ব্যঞ্জনা
এবার খুঁজে দেখি মূল আইনের ভেতর কী ছিল। মূল আইনে সন্তানের সংজ্ঞা হিসেবে বলা ধারা ২(ঘ) তে বলা হয় সন্তান অর্থ পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যা। ধারা ৪ অনুযায়ী পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদিকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানিকে ভরণপোষণের দাবিদার উল্লেখ করা হয়। এখানে মূল আইনে ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তানের দায়িত্ব বন্টনে সমতা তৈরি করার চেষ্টা লক্ষ করা যায়।
কিন্তু এখানে সমালোচনা হয় যে, সমান সুযোগ না পেয়ে বেড়ে ওঠা মেয়ে সন্তানের কাঁধে সমান দায় তুলে দেয়া কতটা যৌক্তিক এটা ঠিক যে আজও আমাদের সমাজে বাবা-মায়েরাই বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মেয়ে সন্তানকে ছেলে সন্তানের মতো সমান সুযোগ সুবিধা বা স্বাধীনতা দেন না। হাজারো প্রতিবন্ধকতা পার করে আসতে হয় মেয়েদের। তবুও এই অনুষঙ্গে আইনকে দূষলে ভুলই হবে। কারণ আইন কে দূরদর্শী হতে হয়। আইনটি যদি শুধু ছেলে  সন্তানকে ভরণপোষণের দায় দিত, তা পিতা-মাতার কাছে বৈষম্যের আরও একটা উপলক্ষ এনে দিত। ছেলেকে কষ্ট করে বড় করলে ভরণপোষণ আদায় করা যাবে, কিন্তু মেয়েকে যত কষ্ট করে বড় করো ভরণপোষণ আদায় করা যাবে না- এমন একটা ধারণা তৈরি হতো। বরং আইনে পুত্র কন্যাকে যে সমান দায় বন্টন করা হয়েছিল, তা পিতা-মাতাকে পুত্র-কন্যা উভয়কেই সমান চোখে দেখতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাই এদিক থেকে ২০১৩ সালের আইনটি আশাব্যঞ্জক ছিল।
বিধিমালার ভাব এবং ভঙ্গিমা
কিন্তু, বিধিমালায় এসে ভাব এবং ভঙ্গিমা এমন হয়ে গিয়েছে যেন, সন্তান বলতে কেবল ছেলে সন্তানকে বোঝানো হয়েছে। যেমন সন্তান বা তার স্ত্রী এভাবে বর্ণনা হয়েছে বারবার। অথচ সন্তান বা তার স্বামী এভাবে উল্লেখ হয়নি কোথাও। বিধিমালার ১৮ ধারায় বলা হয়, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার যথোপযুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। সন্তান নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলে তার স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের দিয়ে মা-বাবার উপর্যুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
এই বাক্যে স্পষ্ট যে এখানে সন্তান বলতে বোঝানো হয়েছে। তা ছাড়া নারীরা তার শ্বশুর শাশুড়ির দেখভাল করতে দায়বদ্ধ হলেও পুরুষ তেমনটি নন। মূল আইনের ধারা ২(ঘ) অনুযায়ী নারী নিজের বাবা মাকে দেখভাল করতেও দায়বদ্ধ। তাহলে নারীর দায়বদ্ধতা দ্বিগুণ করা হয়েছে বিধিমালায়। পুুরুষের দায়বদ্ধতা কেবল নিজের বাবা-মার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটি নারীর সঙ্গে একপ্রকার অসমতা হলো সেটা বলাই যায়।
এ ক্ষেত্রে, সমস্যা ঠিক কোথায়? বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ পুরুষই তার স্ত্রীকে চাকরি করতে দিতে চান না। নিজস্ব রোজগার না থাকায় মেয়ে চাইলেও তার পক্ষে নিজের বাবা-মার দেখভাল করার সুযোগ থাকে না। উলটো দিকে, যদি কোনো দম্পত্তির পুত্র সন্তান না থাকে, কেবল কন্যা সন্তান থাকে আর সেই কন্যা সন্তান যদি কর্মজীবী না হন, সে ক্ষেত্রে এই পুত্রকেন্দ্রিক আইন অনুযায়ী কন্যা সন্তানের বাবা-মায়ের কোনো ভরণপোষণ পাবার সুযোগ থাকছে না। বর্তমান সমাজের মানসে যে ভাব ফুটে ওঠে তা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামীর সংসারের চাপ নারীকে আর্থিক সফলতা অন্বেষণ থেকে আটকে রাখে। অথচ আইন অনুযায়ী তার ওপর বাবা মায়ের ভরণপোষণ করার দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে। তাই নারী যেমন শ্বশুর শাশুড়ির দেখভাল করার দায় নিচ্ছে, পুরুষেরও তেমন স্ত্রীর বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বে অংশীদার হতে হবে। এতে করে পিতা-মাতাও যেমন কন্যাসন্তানকে বৈষম্যের চোখে দেখবেন না, তেমনি স্বামীরাও স্ত্রীকে কাজ করতে উৎসাহ দেবেন। কেননা অন্যথা নিজেকেই স্ত্রীর পিতামাতার ভরণপোষণের দায় নিতে হবে।
বিধিমালায় দায়িত্বে সুষম বন্টন না হলে এই বিধিমালা পুত্রসন্তান কামনাকে উৎসাহিত করবে। এমন বিধিমালা সমাজের সবার কাছে এই তথ্যই পৌছে দেয় যে, পিতা-মাতার ভরণপোষণ শুধু পুত্রের দায়িত্ব এবং পুত্রসন্তান না থাকলে শেষ জীবনে ভরণপোণ নিশ্চিত করার কেউ থাকবে না।
২০১৯ সালে এসে কোনো আইন বা তার বিধিমালা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার সহায়ক হবে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।


সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর