২৩ জুলাই তাজউদ্দীন আহমদ - এর ৯০ তম জন্ম দিন
- এস. এম শফিকুল ইসলাম কানু : মহান মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের একটি সামরিক ঘাঁটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। মুজিব নগর সরকারের নামে পরিচিত অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় করার জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এসেছিলেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাশে স্থাপিত রি-ফ্রেসমেন্ট রুম প্রাঙ্গণে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আহবান জানান।
উক্ত সমাবেশে প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী, একই সামরিক ঘাটিতে প্রশিক্ষণরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম পুত্র শেখ কামাল ও কয়েকজন প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধা বক্তব্য রাখেন। এ সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল যোশীও উপস্থিত ছিলেন। সেদিন প্রথম আমার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ওনার পরনে ছিল প্যান্ট, গায়ে সাদা হাফ সার্ট। সাধারন গড়নের  একজন মানুষের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাব প্রত্যক্ষ করলাম।
তাজউদ্দীন আহমেদ ১৯২৫ সালে ২৩ জুলাই ভাওয়াল রাজার স্মৃতি বিজড়িত গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী ইয়াসিন খান ও মাতা মেহেরুননেসা। তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার দরুন তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন। পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্রো বলেছিলেন, শেখ মুজিবের থেকে তার পিছনে ফাইল বহনকারী ব্যক্তিটি (তাজ উদ্দীন আহমদ) একদিন পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। ভুট্রোর এই আশংকা সত্যে পরিনত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি সত্বেও তাজউদ্দীন আহমেদ এর দৃঢ় ও দুরদর্শী নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় অবিস্বরনীয় ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলে তিনি দেশের পূর্ণগঠনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী প্রতিটি সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা দেশের সার্বভৌমত্বসহ দেশের পূর্ণগঠনে নিয়োজিত থাকবেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, যে সকল মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ শিক্ষিত তাদেরকে সেনাবাহিনীতে কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তা (ক্যাডার সার্ভিস) পদে নিয়োজিত করা, যারা কম শিক্ষিত তাদেরকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, রাইফেলস্ কিংবা অন্যান্য বাহিনীতে সংযুক্তকরণ। অন্যদেরকে যেকোন সরকারী চাকুরীতে নিয়োজিত করা।
এরপরেও যদি কেউ বাদ পরে তারা নিজেদের এলাকায় গিয়ে দেশের পুর্ণগঠনে অর্থাৎ উন্নয়ন মূলক কাজে আত্মনিয়োগ করবেন। এদের প্রত্যেককে সরকারী ভাতা প্রদান করা হবে। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ এর এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্ত সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নিয়ে মাত্র ৩০ টাকা দিয়ে বাড়ীতে পাঠানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদ এর প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে দেশে লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি হতো না।
বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদ থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে বাদ দেয়া হলেও ১৫ আগস্টের ঘাতকেরা তাকে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলি করে হত্যা করেছিল। বাংলার ইতিহাসে তাজউদ্দীনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। শুধু তাজউদ্দীনেই নন তাঁর স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগের দুর্দিনে সভাপতির পদে থেকে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছিলেন। - লেখক গেরিলা লিডার
সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর