প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির সাড়ে সাত বছর পরেও তিনবিঘা আন্তঃনগর একপ্রেস ট্রেন চালু হয়নি
স্টাফ রিপোর্টার: বার্তা রিপোর্ট ॥ ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামে এক বিশাল জনসমাবেশে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুড়িমারী ঢাকা-বুড়িমারী তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর ঘোষণা দেন। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জেলা শহরের কালেক্টরেট মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ  আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনবিঘা এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর ঘোষণা পূর্ণব্যক্ত করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবদীপ্ত রংপুরাঞ্চলের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে মুক্তাঞ্চলে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ৬নং সেক্টর হেড কোয়ার্টার। বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত এই সেক্টর হেড কোয়ার্টার থেকে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল মিলিটারী ফোর্স ও সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী। এখানে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, পর্যবেক্ষক ও মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসেছিলেন। এখানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মিলিটারী ও গেরিলা বাহিনীর ভিডিও চিত্র ধারণ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রতি বিশ্ব জনমত গড়ে উঠে।
অপরদিকে পাটগ্রাম উপজেলায় তিনবিঘা করিডোরের দরুন দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতায় প্রায় ৭ হাজার মানুষ ৪০ বছর অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। দেশের মূল ভূখন্ডের সাথে তাদের কোন যোগাযোগ ছিল না। ভারতীয় বিএসএফ, পুলিশ ও উৎশৃঙ্খল জনতা কর্তৃক ছিট মহলবাসী নির্যাতিত, নিপীড়িত, লুন্ঠিত, হত্যাকান্ড ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিল। এই দুটি স্থানের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বুড়িমারী থেকে তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর দাবী তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই দাবীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রেন চালুর ঘোষণা দেন।
লালমনিরহাট জেলা শহর থেকে পাটগ্রামের বুড়িমারী দূরত্ব প্রায় ১ শত কিলোমিটার। বুড়িমারীতে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর। তাছাড়া বুড়িমারী ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনাসহ অন্যান্য জেলার মানুষ চিকিৎসা, ভ্রমণ, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিকট-আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাতের জন্য হাজার হাজার যাত্রী ভারতে গমনাগমন করে থাকে।
জেলা মটর মালিক সমিতির এক ঘুয়েমী সিদ্ধান্তের কারণে বুড়িমারী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে দিবা কোর্স সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। তাই হাজার হাজার শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা যাত্রীসহ সাধারণকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত্রিকালীন বাসে চলাচল করতে হয়। তাই তিনবিঘা আন্তঃনগর একপ্রেক্স জেলাবাসীসহ দেশবাসীর নিকট খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাক্তন রেলপথ মন্ত্রী মজিবুল হক ২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারী ৩ দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনের জন্য লালমনিরহাটে আসেন। সে সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজসেবীদের দাবীর প্রেক্ষিতে রেলমন্ত্রী জানান,  প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা আমার জন্য একমাত্র বাধ্যতামূলক। ঢাকায় ফিরে গিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ারও কথা বলেন। কিন্তু কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পঞ্চগড় থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য এ্যাডঃ নুরুল ইসলাম সুজন রেলমন্ত্রী হন। তিনি গত ২২ মার্চ বুড়িমারী রেলস্টেশন ও বুড়িমারী  জিরো পয়েন্টের রেলওয়ে লাইন পরিদর্শন করেন। এ সময় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ে তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসে তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস  ট্রেন চালুর কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, বুড়িমারী স্টেশন হয়ে ভারতের চ্যাংরাবান্ধায় রেলওয়ে যোগাযোগ পুনঃন্থাপন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি পুর্নব্যক্ত করা হলেও তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেনি রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের ইঞ্চিন ও ট্রেনের কোচের মারাত্মক সংকট রয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে এই বিভাগে ট্রেন চলাচল করছে। নতুন করে তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করতে হলে নতুন ইঞ্চিন ও কোচের প্রয়োজন হবে। তাছাড়াও বুড়িমারী রেলওয়ে স্টেশনে ওয়াশগীট ও নতুন রার্নিং লাইন স্থাপন, স্টাফদের কোয়ার্টার নির্মাণ এবং লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। এখন পর্যন্ত  এতদবিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তাই তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস চালুর বিষয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রেলমন্ত্রী এ্যাডঃ নুরুল ইসলাম সুজন তার ক্ষমতাবলে ৩ মাসের মধ্যে পঞ্চগড়-ঢাকা-পঞ্চগড় আন্তঃনগর এক্সপ্রেস চালু করতে পেরেছেন। তিনবিঘা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করতে অনুরূপ নেতৃত্বের প্রয়োজন হবে। সর্বোপরি লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী  ও সুধীবৃন্দের কোন সু-সম্পর্ক নেই। কাজেই যেভাবে লালমনিরহাট  রেলওয়ে বিভাগ চলছে সেই ভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকবে। পরির্তনের আশা সুদৃঢ় পরাহত।


সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর